পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের অষ্টম অধ্যায় — আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স। আলোর বেগ কখনো ছাড়ানো যায় না কেন, GPS-এ আপেক্ষিকতার সংশোধন লাগে কেন, অপটিক্যাল ফাইবারে সংকেত হারায় না কেন — এই অধ্যায়ের অনুধাবনমূলক প্রশ্নগুলো আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম ধারণা ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ঘিরে। এই পোস্টে অধ্যায়ের সব গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর একসাথে সাজানো হয়েছে — বোর্ড পরীক্ষা ও কলেজ টেস্ট পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে। প্রতিটি উত্তর ২ নম্বরের উপযোগী করে সংক্ষিপ্ত ও ধারণা-নির্ভর করে লেখা।
অনুধাবনমূলক প্রশ্নের তালিকা
- প্রশ্ন 01: আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার দুটি স্বীকার্য কী? আলোর বেগ সব পর্যবেক্ষকের কাছে সমান হয় কেন?
- প্রশ্ন 02: দৈর্ঘ্য সংকোচন বলতে কী বোঝ? চলন্ত বস্তু কি সত্যিই খাটো হয়ে যায়?
- প্রশ্ন 03: সময় প্রসারণ বলতে কী বোঝ? মিউঅন কণা পৃথিবীতে পৌঁছানো এর প্রমাণ কেন?
- প্রশ্ন 04: ভর-শক্তি সমতুল্যতা E = mc² বলতে কী বোঝ? সূর্যের শক্তির উৎসের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
- প্রশ্ন 05: আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া আলোর কণা-স্বভাবের প্রমাণ কেন?
- প্রশ্ন 06: তীব্রতা বাড়ালেই ইলেকট্রন নির্গত হয় না, কিন্তু কম্পাঙ্ক বাড়ালে হয় কেন?
- প্রশ্ন 07: কম্পটন ক্রিয়ায় বিক্ষিপ্ত X-রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় কেন?
- প্রশ্ন 08: দ্য ব্রগলির বস্তু-তরঙ্গ বলতে কী বোঝ? ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে এটি কীভাবে কাজে লাগে?
- প্রশ্ন 09: X-রশ্মি কীভাবে উৎপন্ন হয়? ক্যাথোড রশ্মির সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
- প্রশ্ন 10: তেজস্ক্রিয় বিকিরণে আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির ভেদন ক্ষমতা ভিন্ন কেন?
- প্রশ্ন 11: অর্ধায়ু বলতে কী বোঝ? কার্বন ডেটিংয়ে তেজস্ক্রিয়তা কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
- প্রশ্ন 12: ভর ত্রুটি ও বন্ধন শক্তি বলতে কী বোঝ? নিউক্লিয়াসের ভর উপাদানগুলোর ভরের যোগফলের চেয়ে কম কেন?
- প্রশ্ন 13: নিউক্লিয়ার ফিশন ও ফিউশনের শক্তি কোথা থেকে আসে?
- প্রশ্ন 14: রেডিও সম্প্রচারে মডুলেশন প্রয়োজন কেন?
- প্রশ্ন 15: AM অপেক্ষা FM সম্প্রচারে শব্দের মান ভালো হয় কেন?
- প্রশ্ন 16: অপটিক্যাল ফাইবারে আলোক সংকেত দূর পর্যন্ত প্রায় ক্ষয় ছাড়াই যায় কেন?
- প্রশ্ন 17: জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য সুবিধাজনক কেন?
- প্রশ্ন 18: কোনো বস্তুকে আলোর বেগে ছোড়া সম্ভব নয় কেন?
- প্রশ্ন 19: কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ ব্যাখ্যায় প্লাংকের কোয়ান্টাম ধারণার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?
- প্রশ্ন 20: GPS সিস্টেমে আপেক্ষিকতার সংশোধন না করলে অবস্থান ভুল হয় কেন?
- প্রশ্ন 21: ফোটনের ভরবেগ আছে — বিকিরণ চাপ বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 22: কণা পদার্থবিজ্ঞানে শক্তির একক হিসেবে ইলেকট্রন-ভোল্ট (eV) সুবিধাজনক কেন?
প্রশ্ন 01: আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার দুটি স্বীকার্য কী? আলোর বেগ সব পর্যবেক্ষকের কাছে সমান হয় কেন?
উত্তর: দুটি স্বীকার্য: (1) পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে একই রূপে প্রযোজ্য — কোনো কাঠামোই বিশেষ মর্যাদা পায় না; (2) শূন্যে আলোর বেগ (c ≈ 3 × 10⁸ m/s) উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতি নির্বিশেষে সব জড় কাঠামোতে সমান। দ্বিতীয় স্বীকার্যটি মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার ফল — পৃথিবীর গতি যেদিকেই হোক, আলোর বেগে কোনো পার্থক্য ধরা পড়েনি, অর্থাৎ “ইথার” নামের মাধ্যমের অস্তিত্ব নেই যার সাপেক্ষে বেগ মাপা যাবে। আলোর বেগ ধ্রুব রাখতে গিয়েই স্থান ও কালকে নমনীয় হতে হয় — দৈর্ঘ্য সংকোচন ও সময় প্রসারণ সেই সমন্বয়েরই ফল। চিরায়ত বেগ-যোগ সূত্র (u + v) আলোর ক্ষেত্রে খাটে না; আপেক্ষিক বেগ-যোগে ফল কখনোই c ছাড়ায় না। এই দুটি স্বীকার্য থেকে পুরো বিশেষ আপেক্ষিকতা গাণিতিকভাবে বেরিয়ে আসে — এটাই এর সৌন্দর্য।
প্রশ্ন 02: দৈর্ঘ্য সংকোচন বলতে কী বোঝ? চলন্ত বস্তু কি সত্যিই খাটো হয়ে যায়?
উত্তর: কোনো বস্তু পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে v বেগে চললে গতির দিকে তার পরিমাপকৃত দৈর্ঘ্য L = L₀√(1 − v²/c²) হয় — স্থির কাঠামোর দৈর্ঘ্য L₀-এর চেয়ে কম। এটি কোনো যান্ত্রিক চাপে সঙ্কুচিত হওয়া নয় — বস্তুটির নিজের কাঠামোতে (যেখানে সে স্থির) তার দৈর্ঘ্য পুরোপুরি L₀-ই থাকে; সংকোচন ঘটে অন্য কাঠামো থেকে “পরিমাপ” করার পদ্ধতিতে, কারণ আপেক্ষিকতায় যুগপত্তা (simultaneity) পরম নয় — দুই প্রান্তের অবস্থান একই মুহূর্তে ধরা বিভিন্ন কাঠামোতে বিভিন্ন ঘটনা নির্দেশ করে। সংকোচন শুধু গতির দিকেই হয়, লম্ব দিকে নয়। দৈনন্দিন বেগে v²/c² এত ক্ষুদ্র যে প্রভাব শূন্যের কাছাকাছি — উল্লেখযোগ্য হতে হলে বেগ c-এর উল্লেখযোগ্য ভগ্নাংশ হতে হয়। পারস্পরিকতাও আছে: চলন্ত কাঠামোর পর্যবেক্ষকও স্থির কাঠামোর রডকে সংকুচিত মাপবে — দুজনেই নিজ নিজ পরিমাপে সঠিক।
প্রশ্ন 03: সময় প্রসারণ বলতে কী বোঝ? মিউঅন কণা পৃথিবীতে পৌঁছানো এর প্রমাণ কেন?
উত্তর: চলন্ত ঘড়ি স্থির ঘড়ির তুলনায় ধীরে চলে: Δt = Δt₀/√(1 − v²/c²) — চলন্ত কাঠামোতে অতিবাহিত সময় বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে বেশি মনে হয়। প্রমাণ — মিউঅন: বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বস্তরে সৃষ্ট মিউঅনের নিজস্ব আয়ুষ্কাল মাত্র 2.2 μs; আলোর কাছাকাছি বেগেও এই সময়ে সে প্রায় 660 m-এর বেশি যাওয়ার কথা নয়, অথচ ভূপৃষ্ঠে প্রচুর মিউঅন ধরা পড়ে, যাদের 10–15 km পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ব্যাখ্যা: পৃথিবীর কাঠামোতে মিউঅনের ঘড়ি ধীর চলে — তার কার্যকর আয়ু γ গুণ বেড়ে যায়; আর মিউঅনের নিজের কাঠামোতে বায়ুমণ্ডলের পুরুত্ব দৈর্ঘ্য-সংকোচনে কমে যায় — দুটি বর্ণনাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কণা ত্বরণযন্ত্রে প্রতিদিন এই প্রভাব মেপে যাচাই করা হয়; এটি কেবল তত্ত্বের পাতায় নেই।
প্রশ্ন 04: ভর-শক্তি সমতুল্যতা E = mc² বলতে কী বোঝ? সূর্যের শক্তির উৎসের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
উত্তর: ভর ও শক্তি একই জিনিসের দুটি রূপ — ভরকে শক্তিতে ও শক্তিকে ভরে রূপান্তর করা যায়, রূপান্তর হার E = mc²। c² বিশাল (9 × 10¹⁶) বলে সামান্য ভরও বিশাল শক্তির সমতুল্য: 1 g ভর পুরোপুরি শক্তি হলে প্রায় 9 × 10¹³ J পাওয়া যেত। সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 6 × 10¹¹ kg হাইড্রোজেন ফিউশনে হিলিয়ামে পরিণত হয়; উৎপাদের ভর বিক্রিয়কগুলোর চেয়ে প্রায় 0.7% কম — এই হারানো ভরই শক্তি হয়ে বেরিয়ে আসে, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 4 × 10⁹ kg ভর শক্তিতে রূপ নেয়। অর্থাৎ সূর্য আসলে ভর খরচ করে জ্বলছে। পারমাণবিক বিক্রিয়া ছাড়া দৈনন্দিন রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও ভর-পরিবর্তন ঘটে, তবে তা এতই নগণ্য (10⁻¹⁰ ভগ্নাংশ) যে মাপা যায় না — তাই রসায়নে ভর সংরক্ষণ কার্যত সত্য মনে হয়।
প্রশ্ন 05: আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া আলোর কণা-স্বভাবের প্রমাণ কেন?
উত্তর: ধাতব পৃষ্ঠে আলো ফেললে ইলেকট্রন নির্গত হওয়ার এই ঘটনায় তরঙ্গ মতবাদ তিনটি পর্যবেক্ষণ ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ: (1) নির্দিষ্ট সীমা কম্পাঙ্কের (ν₀) নিচের আলো যত তীব্রই হোক, কোনো ইলেকট্রন বেরোয় না; তরঙ্গ মতে তীব্র আলোর শক্তি জমে ইলেকট্রন বের হওয়ার কথা। (2) নির্গমন তাৎক্ষণিক — দুর্বল আলোতেও দেরি হয় না; তরঙ্গে শক্তি ছড়িয়ে থাকায় জমতে সময় লাগত। (3) নির্গত ইলেকট্রনের সর্বোচ্চ গতিশক্তি তীব্রতার ওপর নয়, কম্পাঙ্কের ওপর নির্ভর করে। আইনস্টাইনের ফোটন ধারণা তিনটিই ব্যাখ্যা করে: আলো আসে E = hν শক্তির প্যাকেটে; একটি ফোটন একটি ইলেকট্রনকে পুরো শক্তি একবারে দেয় — hν > কার্য অপেক্ষক (φ) হলেই নির্গমন, বাড়তি অংশ গতিশক্তি। তীব্রতা শুধু ফোটনের সংখ্যা (তাই নির্গত ইলেকট্রনের সংখ্যা) বাড়ায়।
প্রশ্ন 06: তীব্রতা বাড়ালেই ইলেকট্রন নির্গত হয় না, কিন্তু কম্পাঙ্ক বাড়ালে হয় কেন?
উত্তর: কারণ ইলেকট্রন একবারে একটি মাত্র ফোটনের শক্তি গ্রহণ করে — ফোটনের মোট সংখ্যা (তীব্রতা) তার পাওয়া শক্তির পরিমাণ বদলায় না। প্রতিটি ফোটনের শক্তি E = hν শুধু কম্পাঙ্কের ওপর নির্ভরশীল। কম্পাঙ্ক সীমা মানের নিচে থাকলে প্রতিটি ফোটনই কার্য অপেক্ষক φ-এর চেয়ে দুর্বল — কোটি কোটি এমন ফোটন এলেও কোনো একক ইলেকট্রন বের হওয়ার মতো শক্তি পায় না (ইলেকট্রন একাধিক ফোটনের শক্তি মজুত করে রাখতে পারে না)। কম্পাঙ্ক বাড়িয়ে hν > φ করলেই একটি ফোটনই যথেষ্ট — নির্গমন শুরু হয়, এবং বাড়তি শক্তি (hν − φ) গতিশক্তি হিসেবে আসে। ব্যবহারিক দিক: এ কারণে UV আলোতে কাজ করা ফটোসেল লাল আলোর প্রখর রশ্মিতেও সাড়া দেয় না — সৌর প্যানেলের দক্ষতার সীমাও এই একই পদার্থবিজ্ঞান নির্ধারণ করে।
প্রশ্ন 07: কম্পটন ক্রিয়ায় বিক্ষিপ্ত X-রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় কেন?
উত্তর: কম্পটন X-রশ্মির ফোটনকে কণা হিসেবে ধরে স্থির ইলেকট্রনের সঙ্গে তার স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ বিবেচনা করেন। সংঘর্ষে ফোটন তার শক্তির একটি অংশ ইলেকট্রনকে গতিশক্তি হিসেবে দিয়ে দেয় — শক্তি হারানোয় ফোটনের কম্পাঙ্ক কমে, ফলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়ে: Δλ = (h/m₀c)(1 − cosθ)। এই বৃদ্ধি শুধু বিক্ষেপণ কোণ θ-এর ওপর নির্ভর করে, আপতিত তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা লক্ষ্যবস্তুর উপাদানের ওপর নয় — পরীক্ষায় ঠিক তাই পাওয়া গেছে। তরঙ্গ মতবাদে বিক্ষিপ্ত বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য একই থাকার কথা ছিল — পার্থক্যটাই ফোটনের বাস্তব কণা-চরিত্রের (শক্তি ও ভরবেগবিশিষ্ট) সরাসরি প্রমাণ। সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পশ্চাৎ বিক্ষেপণে (θ = 180°) হয়, যেখানে ইলেকট্রন সর্বাধিক শক্তি পায়।
প্রশ্ন 08: দ্য ব্রগলির বস্তু-তরঙ্গ বলতে কী বোঝ? ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে এটি কীভাবে কাজে লাগে?
উত্তর: দ্য ব্রগলি প্রস্তাব করেন: আলোর মতো বস্তুকণারও দ্বৈত স্বভাব আছে — v বেগে চলন্ত m ভরের কণার সঙ্গে যুক্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্য λ = h/mv। দ্রুতগামী ইলেকট্রনের λ দৃশ্যমান আলোর চেয়ে হাজার গুণ ছোট হতে পারে। বিচ্ছেদন সীমা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক (θ_min ∝ λ) — তাই ইলেকট্রন রশ্মি দিয়ে গঠিত প্রতিবিম্বে আলোর মাইক্রোস্কোপের চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম বিবরণ ধরা পড়ে; ডেভিসন-গার্মারের পরীক্ষায় ইলেকট্রনের অপবর্তন ধরা পড়ায় তরঙ্গ-স্বভাব প্রমাণিত হয়। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ত্বরিত ইলেকট্রনের λ প্রায় পিকোমিটার মাত্রার — বিবর্ধন দশ লক্ষ গুণ পর্যন্ত সম্ভব, ভাইরাস ও অণুর গঠন দেখা যায়। তবে নমুনার প্রস্তুতি জটিল ও নমুনা ভ্যাকুয়ামে রাখতে হয় — এগুলোই এর সীমাবদ্ধতা।
প্রশ্ন 09: X-রশ্মি কীভাবে উৎপন্ন হয়? ক্যাথোড রশ্মির সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
উত্তর: X-নলে ক্যাথোড থেকে নির্গত দ্রুতগামী ইলেকট্রন উচ্চ বিভব পার্থক্যে ত্বরিত হয়ে ভারী ধাতব লক্ষ্যবস্তুতে (টাংস্টেন) আঘাত করলে দুই প্রক্রিয়ায় X-রশ্মি উৎপন্ন হয়: (1) ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ মন্দিত হলে হারানো গতিশক্তি ফোটন আকারে বেরোয় — এটি অবিচ্ছিন্ন বর্ণালির ব্রেমস্ট্রালুং বিকিরণ; (2) ভেতরের কক্ষের ইলেকট্রন ছিটকে গেলে বাইরের কক্ষের ইলেকট্রন এসে শূন্যতা পূরণ করার সময় বৈশিষ্ট্যসূচক রেখা বর্ণালি নির্গত হয়। ক্যাথোড রশ্মি হলো স্বয়ং ইলেকট্রনের ধারা — ঋণাত্মক আধানযুক্ত, ভরবিশিষ্ট, তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রে বেঁকে যায়; X-রশ্মি তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ — আধানহীন, ভরহীন, ক্ষেত্রে বেঁকে না, ভেদন ক্ষমতা অনেক বেশি। অর্থাৎ ক্যাথোড রশ্মি “কারণ”, X-রশ্মি তার আঘাতের “ফল”।
প্রশ্ন 10: তেজস্ক্রিয় বিকিরণে আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির ভেদন ক্ষমতা ভিন্ন কেন?
উত্তর: ভেদন ক্ষমতা নির্ভর করে কণাটি পদার্থে কত দ্রুত শক্তি হারায় তার ওপর — আয়নায়ন ক্ষমতা যত বেশি, ভেদন তত কম (শক্তি পথেই খরচ হয়ে যায়)। আলফা কণা: ভর বেশি, আধান +2e — শক্তিশালী আয়নায়নে দ্রুত শক্তি হারায়, কাগজের পাতায় বা ত্বকের বাইরের স্তরেই থেমে যায়, তবে শরীরের ভেতরে গেলে সবচেয়ে বিপজ্জনক। বিটা কণা (ইলেকট্রন): হালকা, আধান এক একক — মাঝারি আয়নায়ন, কয়েক মিমি অ্যালুমিনিয়ামে থামে। গামা রশ্মি: আধানহীন ফোটন — সরাসরি আয়নায়ন করে না, সম্ভাবনা-নির্ভর প্রক্রিয়ায় শক্তি হারায়, তাই সীসার পুরু পাতও আংশিকভাবে পেরিয়ে যায়। এই পার্থক্যই সুরক্ষা-নকশা ঠিক করে: আলফার জন্য কাগজই যথেষ্ট, গামার জন্য পুরু সীসা/কংক্রিট লাগে। গতিবেগের ভূমিকাও আছে — আলফা ধীর (প্রায় 0.05c) বলে প্রতি একক পথে বেশি সময় কাটিয়ে বেশি আয়নায়ন করে।
প্রশ্ন 11: অর্ধায়ু বলতে কী বোঝ? কার্বন ডেটিংয়ে তেজস্ক্রিয়তা কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: অর্ধায়ু (T½) হলো সেই সময়, যাতে কোনো তেজস্ক্রিয় নমুনার অর্ধেক নিউক্লিয়াস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; ক্ষয় সূত্র N = N₀(1/2)^(t/T½) — ক্ষয় একটি পরিসংখ্যানগত প্রক্রিয়া, কোন নিউক্লিয়াসটি কখন ক্ষয় হবে তা বলা যায় না, তাপ-চাপ দিয়েও হার বদলানো যায় না। কার্বন ডেটিং: জীবিত প্রাণীতে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সাম্য রেখে ¹⁴C/¹²C অনুপাত ধ্রুব থাকে; মৃত্যুর পর বিনিময় বন্ধ হয়ে ¹⁴C ক্ষয় হতে থাকে (T½ = 5730 বছর) — প্রাচীন নমুনায় অবশিষ্ট অনুপাত মেপে অতিবাহিত সময় হিসাব করা যায়, কার্যত প্রায় 50,000 বছর পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য। প্রত্নতত্ত্বে এটি বিপ্লব ঘটিয়েছে। শর্ত: নমুনাটি একসময় জীবিত থাকতে হয় — শিলা বা ধাতুর বয়সে এই পদ্ধতি খাটে না, সেখানে অন্য আইসোটোপ (U-Pb) লাগে।
প্রশ্ন 12: ভর ত্রুটি ও বন্ধন শক্তি বলতে কী বোঝ? নিউক্লিয়াসের ভর উপাদানগুলোর ভরের যোগফলের চেয়ে কম কেন?
উত্তর: নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর তার পৃথক প্রোটন ও নিউট্রনগুলোর মোট ভরের চেয়ে সবসময় কম — এই ঘাটতিই ভর ত্রুটি (Δm)। কারণ: আলাদা নিউক্লিয়নগুলোকে বেঁধে নিউক্লিয়াস গঠনের সময় শক্তি নির্গত হয়, আর E = mc² অনুযায়ী নির্গত শক্তির সমতুল্য ভর সিস্টেম থেকে বাদ পড়ে যায়। এই নির্গত শক্তিই বন্ধন শক্তি (B = Δm·c²) — নিউক্লিয়াস ভাঙতে হলে ঠিক এই পরিমাণ শক্তি বাইরে থেকে দিতেই হবে। প্রতি নিউক্লিয়নে বন্ধন শক্তি লোহা-56-এর কাছে সর্বোচ্চ (প্রায় 8.8 MeV) — তাই তার দুই পাশের দুই ধরনের বিক্রিয়ায়ই (ভারীর ফিশন, হালকার ফিউশন) শক্তি মুক্ত হয়। বন্ধন শক্তি যত বেশি, নিউক্লিয়াস তত স্থিতিশীল — এই বক্ররেখাটি পুরো নিউক্লিয়ার শক্তি-অর্থনীতির ভিত্তি।
প্রশ্ন 13: নিউক্লিয়ার ফিশন ও ফিউশনের শক্তি কোথা থেকে আসে?
উত্তর: দুটোরই উৎস একই: বিক্রিয়ায় উৎপাদসমূহের মোট ভর বিক্রিয়কগুলোর চেয়ে কম হয়, আর হারানো ভর E = Δm·c² হারে শক্তি হয়ে বেরিয়ে আসে। ফিশনে ভারী নিউক্লিয়াস (যেমন ²³⁵U) ভেঙে মাঝারি ভরের দুটি খণ্ডে পরিণত হয় — খণ্ডগুলোর প্রতি-নিউক্লিয়ন বন্ধন শক্তি বেশি (স্থিতিশীলতা বেশি) বলে ভর কমে। ফিউশনে হালকা নিউক্লিয়াস (হাইড্রোজেন আইসোটোপ) জুড়ে ভারী নিউক্লিয়াস হয় — সেখানেও একই কারণে ভর কমে। পার্থক্য বাস্তবায়নে: ফিশন নিউট্রন-শৃঙ্খলে ঘরের তাপমাত্রায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য (রিঅ্যাক্টর), ফিউশনের জন্য কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রা লাগে (সূর্যে স্বাভাবিক, পৃথিবীতে এখনো গবেষণাধীন)। ফিশন বর্জ্যে দীর্ঘজীবী তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ থাকে — ফিউশনে সেই সমস্যা অনেক কম। প্রতি একক জ্বালানিতে ফিউশন ফিশনের চেয়েও বেশি শক্তি দেয়।
প্রশ্ন 14: রেডিও সম্প্রচারে মডুলেশন প্রয়োজন কেন?
উত্তর: শব্দের কম্পাঙ্ক মাত্র 20 Hz–20 kHz — এই কম কম্পাঙ্কে সরাসরি সম্প্রচার অকার্যকর তিনটি কারণে: (1) দক্ষ বিকিরণের জন্য অ্যান্টেনার আকার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তুলনীয় (প্রায় λ/4) হতে হয়; অডিওর λ কিলোমিটার মাত্রার — এত বড় অ্যান্টেনা অবাস্তব। উচ্চ কম্পাঙ্কের বাহক তরঙ্গে চাপালে λ মিটার মাত্রায় নেমে আসে, অ্যান্টেনা বাস্তবসম্মত হয়। (2) সব স্টেশন একই অডিও ব্যান্ডে পাঠালে সংকেতগুলো মিশে যেত; আলাদা আলাদা বাহক কম্পাঙ্কে চাপালে রিসিভার টিউন করে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারে। (3) নিম্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দূর পর্যন্ত ভালোভাবে ভ্রমণও করে না। তাই অডিওর তথ্য বাহকের বিস্তার (AM) বা কম্পাঙ্কে (FM) ছাপিয়ে পাঠানো হয় — ডিমডুলেশনে রিসিভার মূল অডিও ফিরে পায়।
প্রশ্ন 15: AM অপেক্ষা FM সম্প্রচারে শব্দের মান ভালো হয় কেন?
উত্তর: বায়ুমণ্ডলীয় ও মানবসৃষ্ট নয়েজ (বজ্রপাত, মোটর, ইগনিশন) প্রধানত বাহক তরঙ্গের বিস্তারকে বিকৃত করে। AM-এ তথ্য বহন করে বিস্তারই — তাই নয়েজ সরাসরি তথ্যের সঙ্গে মিশে শব্দে খসখসে আওয়াজ আসে; রিসিভার তা আলাদা করতে পারে না। FM-এ তথ্য থাকে কম্পাঙ্কের বিচ্যুতিতে, বিস্তার ধ্রুব রাখা হয় — রিসিভার একটি লিমিটার দিয়ে বিস্তারের সব ওঠানামা কেটে ফেলতে পারে, ফলে নয়েজ প্রায় পুরোটাই বাদ পড়ে। সঙ্গে FM-এর ব্যান্ডউইডথ অনেক বেশি (প্রায় 200 kHz বনাম AM-এর 10 kHz) — উচ্চ কম্পাঙ্কের অডিও উপাদানও পাঠানো যায়, শব্দ পূর্ণাঙ্গ হয়। মূল্য দিতে হয় বর্ণালি-জায়গায়: FM স্টেশন বেশি ব্যান্ড জুড়ে থাকে বলে একটি ব্যান্ডে স্টেশন সংখ্যা কম ধরে। ক্যাপচার ইফেক্টের কারণে শক্তিশালী FM সংকেত দুর্বলটিকে চাপা দিয়েও দেয়।
প্রশ্ন 16: অপটিক্যাল ফাইবারে আলোক সংকেত দূর পর্যন্ত প্রায় ক্ষয় ছাড়াই যায় কেন?
উত্তর: ফাইবারের কোরের প্রতিসরণাঙ্ক আবরণের (cladding) চেয়ে বেশি; সংকট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো প্রতিবার পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন করে কোরের ভেতরেই আটকে এগিয়ে যায় — প্রতিফলনে কোনো শক্তি মাধ্যমের সীমানা পেরোয় না বলে প্রতিবারই প্রায় শতভাগ শক্তি ফিরে আসে, ক্ষয় ঘটে শুধু কাচের শোষণ ও বিক্ষেপণে (আধুনিক ফাইবারে মাত্র প্রায় 0.2 dB/km)। ফলে রিলে ছাড়াই দশক কিলোমিটার যাওয়া যায়। অতিরিক্ত সুবিধা: তড়িৎচুম্বক হস্তক্ষেপে অনাক্রম্য, হালকা ও পাতলা তারে বিশাল ব্যান্ডউইডথ (লেজারের উচ্চ কম্পাঙ্কে টেরাবিট তথ্য)। চিকিৎসায় এন্ডোস্কোপেও একই নীতি — ফাইবার গুচ্ছ শরীরের ভেতরের ছবি বাইরে বয়ে আনে। দীর্ঘ দূরত্বে রিপিটার/অ্যামপ্লিফায়ার এখনো লাগে, তবে তামার তারের তুলনায় অনেক কম ঘন ঘন।
প্রশ্ন 17: জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য সুবিধাজনক কেন?
উত্তর: প্রায় 35,786 km উচ্চতায় নিরক্ষীয় তলে ঘূর্ণায়মান স্যাটেলাইটের কক্ষপথ-পর্যায়কাল পৃথিবীর আহ্নিক গতির সমান (24 ঘণ্টা) এবং দিকও একই — ফলে স্যাটেলাইটটি ভূপৃষ্ঠের একটি বিন্দুর ওপরে আপেক্ষিকভাবে স্থির থাকে। সুবিধা: ভূপৃষ্ঠের অ্যান্টেনা একবার স্যাটেলাইটের দিকে তাক করলেই হয় — চলমান লক্ষ্য অনুসরণ (tracking) করা লাগে না; একটি স্যাটেলাইট পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে অবিরত কভারেজ দেয়, তিনটিতে প্রায় পুরো পৃথিবী (মেরু অঞ্চল ছাড়া)। টেলিভিশন সম্প্রচার ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে এটাই আদর্শ। মূল্য: দূরত্ব বেশি বলে সংকেত যেতে-আসতে প্রায় 0.25 s দেরি হয় — লাইভ কথোপকথনে হালকা প্রতিধ্বনি-ভাব টের পাওয়া যায়; মেরু অঞ্চল কভার পায় না, সেখানে নিম্ন-কক্ষপথের স্যাটেলাইট লাগে।
প্রশ্ন 18: কোনো বস্তুকে আলোর বেগে ছোড়া সম্ভব নয় কেন?
উত্তর: আপেক্ষিক ভর (শক্তি) m = m₀/√(1 − v²/c²) — বেগ বাড়লে হর ছোট হয়ে কার্যকর জড়তা বাড়তে থাকে; v → c হলে প্রয়োজনীয় শক্তি অসীমের দিকে যায়। অসীম শক্তি সরবরাহ করা অসম্ভব, তাই ভরবিশিষ্ট কোনো বস্তু কখনোই c-তে পৌঁছাতে পারে না — যত শক্তিই দেওয়া হোক, বেগ c-এর কাছাকাছি ঘুরঘুর করে, ছুঁতে পারে না। ত্বরণযন্ত্রে ইলেকট্রনকে 0.999999c পর্যন্ত ত্বরিত করা গেলেও c হয় না — বরং দেওয়া শক্তি গতিশক্তিতে জমা হয়। শুধু ভরহীন কণা (ফোটন) সবসময় ঠিক c বেগে চলে — তাদের জন্য মাঝামাঝি কোনো বেগ নেই। এই সীমাটি কারিগরি অক্ষমতা নয়, প্রকৃতির সূত্র — সঙ্গে কার্য-কারণের ক্রম রক্ষা পায়: তথ্য c-এর বেশি বেগে গেলে কোনো কাঠামোতে ফল কারণের আগে ঘটত।
প্রশ্ন 19: কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ ব্যাখ্যায় প্লাংকের কোয়ান্টাম ধারণার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?
উত্তর: চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী উত্তপ্ত বস্তুর বিকিরণ বর্ণালিতে উচ্চ কম্পাঙ্কের দিকে শক্তি সীমাহীন বাড়ার কথা — যা পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মেলে না এবং “অতিবেগুনি বিপর্যয়” নামে পরিচিত। প্রকৃত বর্ণালিতে একটি চূড়া থাকে এবং তার পর শক্তি কমে শূন্যের দিকে যায়। প্লাংক (1900) ধরেন: দোলকগুলো শক্তি অবিচ্ছিন্নভাবে নয়, E = nhν আকারের প্যাকেটে (কোয়ান্টা) নির্গত করে। উচ্চ কম্পাঙ্কে একটি প্যাকেটের শক্তিই (hν) এত বড় হয়ে যায় যে তাপীয় শক্তি দিয়ে সেই দোলক উত্তেজিত করাই কঠিন — ফলে উচ্চ কম্পাঙ্কের অবদান চাপা পড়ে, বর্ণালির চূড়া ও ধার দুটোই ব্যাখ্যা মেলে। এই এক অনুমান থেকেই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু — যদিও প্লাংক নিজেও প্রথমে একে গাণিতিক কৌশল ভেবেছিলেন। পরবর্তীতে আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ায় আইনস্টাইন কোয়ান্টাকে বাস্তব কণা (ফোটন) হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন।
প্রশ্ন 20: GPS সিস্টেমে আপেক্ষিকতার সংশোধন না করলে অবস্থান ভুল হয় কেন?
উত্তর: GPS স্যাটেলাইটের ঘড়িকে দুটি বিপরীতমুখী আপেক্ষিক প্রভাব টানে: (1) বিশেষ আপেক্ষিকতা — স্যাটেলাইট প্রায় 14,000 km/h বেগে চলায় তার ঘড়ি প্রতিদিন প্রায় 7 μs ধীর হয়; (2) সাধারণ আপেক্ষিকতা — ওপরের দুর্বল মহাকর্ষে ঘড়ি দ্রুত চলে, প্রায় 45 μs এগিয়ে যায়। নিট প্রভাব: স্যাটেলাইট ঘড়ি প্রতিদিন প্রায় 38 μs এগিয়ে থাকে। আলো 38 μs-এ প্রায় 11 km পথ যায় — সংশোধন না করলে অবস্থান নির্ণয়ে প্রতিদিন প্রায় 10 km ভুল জমত, GPS কয়েক ঘণ্টায়ই অকেজো হয়ে পড়ত। ইঞ্জিনিয়াররা স্যাটেলাইটের ঘড়ি উৎক্ষেপণের আগেই ইচ্ছাকৃতভাবে সামান্য ধীর করে দেন ও সফটওয়্যারে সংশোধন প্রয়োগ করেন। অর্থাৎ দৈনন্দিন প্রযুক্তির ভেতরে আইনস্টাইনের দুই তত্ত্বই প্রতিদিন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে — আপেক্ষিকতা শুধু তাত্ত্বিক কৌতূহলের বিষয় নয়।
প্রশ্ন 21: ফোটনের ভরবেগ আছে — বিকিরণ চাপ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ফোটনের স্থির ভর শূন্য হলেও তার ভরবেগ আছে: p = E/c = h/λ — কম্পটন ক্রিয়ায় ইলেকট্রনকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় এটি সরাসরি মাপা যায়। কোনো পৃষ্ঠে বিকিরণ পড়লে ফোটনগুলো ভরবেগ হস্তান্তর করে — শোষণে একবার, প্রতিফলনে দ্বিগুণ (দিক বদলায় বলে) — ফলে পৃষ্ঠে যে চাপ পড়ে তাকে বিকিরণ চাপ বলে। পৃথিবীতে এর মান অতিক্ষুদ্র (সূর্যালোকে প্রায় 10⁻⁵ N/m²), টের পাওয়া যায় না; কিন্তু মহাকাশে এটি বাস্তব: ধূমকেতুর ধূলিকণার লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে বেঁকে যাওয়ার একটি কারণ বিকিরণ চাপ, এবং সোলার সেইল মহাকাশযান এই চাপে ভর করেই চালানোর পরীক্ষা চলছে। নক্ষত্রের ভেতরে বিকিরণ চাপ মহাকর্ষের টানের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। শিক্ষা: ভরবেগ পেতে ভর থাকা জরুরি নয় — শক্তি থাকলেই চলে।
প্রশ্ন 22: কণা পদার্থবিজ্ঞানে শক্তির একক হিসেবে ইলেকট্রন-ভোল্ট (eV) সুবিধাজনক কেন?
উত্তর: একটি ইলেকট্রন 1 V বিভব পার্থক্য পেরিয়ে ত্বরিত হলে যে গতিশক্তি পায় তাই 1 eV = 1.602 × 10⁻¹⁹ J। পরমাণু ও নিউক্লিয়ার জগতের শক্তিগুলো জুলে প্রকাশ করলে অত্যন্ত ছোট দশমিক সংখ্যা আসে (আয়নায়ন শক্তি প্রায় 2 × 10⁻¹⁸ J) — হিসাব ও তুলনা দুটোই কষ্টকর। eV-তে রসায়ন-স্কেল শক্তি এসে পড়ে সুবিধাজনক সীমায়: হাইড্রোজেনের আয়নায়ন 13.6 eV, নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া MeV মাত্রার, কণা-ত্বরকের শক্তি GeV–TeV। আরেক সুবিধা: ত্বরণ বিভব সরাসরি শক্তি বলে দেয় — 50 kV X-নলে ইলেকট্রনের শক্তি 50 keV, আলাদা হিসাব লাগে না। ভরও E = mc² দিয়ে eV/c² এককে প্রকাশ করা যায় (ইলেকট্রনের ভর 0.511 MeV/c²) — শক্তি, ভর ও ভরবেগ একই ভাষায় কথা বলে, এটাই কণা পদার্থবিজ্ঞানের হিসাবকে মার্জিত করে।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল বার্তা: উচ্চ বেগে ও ক্ষুদ্র স্কেলে চিরায়ত ধারণা বদলে যায় — সময় আপেক্ষিক, শক্তি কোয়ান্টায়িত, ভর-শক্তি একই। পরের পোস্টে আসছে নবম অধ্যায় — পরমাণুর মডেল ও নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান-এর অনুধাবনমূলক ম্যারাথন।
