এইচএসসি জ্যামিতিক আলোকবিজ্ঞান অনুধাবনমূলক ম্যারাথন

পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের ষষ্ঠ অধ্যায় — জ্যামিতিক আলোকবিজ্ঞান। হীরা এত চকচক করে কেন, পুকুর আসল গভীরতার চেয়ে কম মনে হয় কেন, চশমায় অবতল লেন্সই বা কেন — এই অধ্যায়ের অনুধাবনমূলক প্রশ্নগুলো প্রতিফলন, প্রতিসরণ ও লেন্সের ধারণা থেকে আসে। এই পোস্টে অধ্যায়ের সব গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর একসাথে সাজানো হয়েছে — বোর্ড পরীক্ষা ও কলেজ টেস্ট পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে। প্রতিটি উত্তর ২ নম্বরের উপযোগী করে সংক্ষিপ্ত ও ধারণা-নির্ভর করে লেখা।

অনুধাবনমূলক প্রশ্নের তালিকা


প্রশ্ন 01: পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্তগুলো লেখো। লঘু মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে এটি ঘটে না কেন?

উত্তর: শর্ত দুটি: (১) আলোকে ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমের বিভেদতলের দিকে যেতে হবে; (২) আপতন কোণ ওই মাধ্যম-যুগলের সংকট কোণের চেয়ে বড় হতে হবে। ঘন থেকে লঘুতে গেলে প্রতিসরিত রশ্মি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে (প্রতিসরণ কোণ > আপতন কোণ), তাই আপতন কোণ বাড়াতে বাড়াতে একপর্যায়ে প্রতিসরণ কোণ 90° হয় (সংকট কোণ) — এর বেশি আপতনে প্রতিসরণের কোনো বাস্তব সমাধান থাকে না, সমস্ত আলো প্রতিফলিত হয়ে ঘন মাধ্যমেই ফিরে আসে। লঘু থেকে ঘন মাধ্যমে রশ্মি অভিলম্বের দিকে বাঁকে — প্রতিসরণ কোণ সবসময় আপতন কোণের চেয়ে ছোট থাকে, 90° হওয়া অসম্ভব; ফলে কিছু অংশ প্রতিফলিত হলেও মূল অংশ প্রতিসরিত হয়েই যায়। সংকট কোণ sinθ_c = μ_লঘু/μ_ঘন সম্পর্ক দিয়ে পাওয়া যায়।

প্রশ্ন 02: অপটিক্যাল ফাইবার কোন নীতিতে কাজ করে? এর দুটি ব্যবহার লেখো।

উত্তর: অপটিক্যাল ফাইবার পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের নীতিতে কাজ করে। এর গঠন: ভেতরে উচ্চ প্রতিসরণাঙ্কের কোর, বাইরে কম প্রতিসরণাঙ্কের ক্ল্যাডিং। প্রান্ত দিয়ে আলো এমন কোণে ঢোকানো হয় যাতে কোর-ক্ল্যাডিং বিভেদতলে আপতন কোণ সবসময় সংকট কোণের চেয়ে বড় থাকে — ফলে আলো বারবার পূর্ণ প্রতিফলিত হয়ে জিগজ্যাগ পথে ফাইবারের বাঁকানো পথ ধরে অপর প্রান্তে পৌঁছে যায়, প্রায় কোনো ক্ষয় ছাড়াই। ব্যবহার: (১) ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগে ডেটা পরিবহন (তামার তারের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত ও কম ক্ষয়ে); (২) চিকিৎসায় এন্ডোস্কোপ — শরীরের ভেতরের ছবি বাইরে আনা ও আলো ভেতরে পাঠানো। দুটি ক্ষেত্রেই মূল সুবিধা — বাঁকানো নলে আলো পাঠানোর ক্ষমতা।

প্রশ্ন 03: হীরা এত বেশি চকচক করে কেন?

উত্তর: হীরার প্রতিসরণাঙ্ক অনেক বেশি (μ ≈ 2.42), ফলে বায়ুর সাপেক্ষে এর সংকট কোণ খুব ছোট — মাত্র প্রায় 24.4°। হীরার ভেতরে ঢোকা আলো পেছনের পৃষ্ঠগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর চেয়ে বড় কোণে আপতিত হয়, তাই প্রায় পুরো আলোই পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনে বারবার বাউন্স খেয়ে ভেতরে আটকে থাকে এবং শেষমেশ ওপরের ফলকগুলো দিয়ে বেরিয়ে আসে — ক্রাউন কাট ঠিক এভাবেই নকশা করা হয়। সঙ্গে যুক্ত হয় হীরার প্রবল বিক্ষেপণ — বেরোনোর সময় সাদা আলো রঙে ভেঙে যায়, ফলে শুধু উজ্জ্বলতাই নয়, রঙের ঝিলিক (fire)-ও পাওয়া যায়। অন্য স্বচ্ছ পাথরের সংকট কোণ বড় বলে আলো সহজে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায় — চকচকে ভাব কমে। অর্থাৎ হীরার জৌলুসের মূলে উচ্চ μ থেকে আসা ছোট সংকট কোণ।

প্রশ্ন 04: মরুভূমিতে মরীচিকা (মিরাজ) দেখা যায় কেন?

উত্তর: রোদে উত্তপ্ত মরুভূমি বা পিচ রাস্তার কাছের বাতাস সবচেয়ে গরম ও লঘু (কম μ), ওপরে ক্রমশ ঠান্ডা ও ঘন। দূরের বস্তু (গাছ, আকাশ) থেকে আসা রশ্মি নিচের দিকে যাওয়ার পথে ক্রমাগত লঘু স্তরে প্রবেশ করায় স্তরে স্তরে অভিলম্ব থেকে দূরে বেঁকে বেঁকে একপর্যায়ে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে ও রশ্মি ওপরের দিকে উঠে চোখে পৌঁছায়। মস্তিষ্ক ধরে নেয় আলো সোজা এসেছে — তাই বস্তুটি মাটির নিচে প্রতিফলিত অবস্থায় দেখা যায়, যেন পানিতে প্রতিবিম্ব পড়ছে; আকাশের আলোর ক্ষেত্রে এটাই “মরুভূমির হ্রদ”-এর ভ্রম। অর্থাৎ মরীচিকা প্রতিসরণের ধারাবাহিক বাঁক ও পূর্ণ প্রতিফলনের যৌথ ফল — কোনো বাস্তব পানি সেখানে নেই। ঠান্ডা সাগরপৃষ্ঠে উল্টো বিন্যাসে উর্ধ্ব মরীচিকাও দেখা যায়।

প্রশ্ন 05: পুকুরের আপাত গভীরতা আসল গভীরতার চেয়ে কম হয় কেন?

উত্তর: পুকুরের তলদেশের কোনো বিন্দু থেকে আসা আলো পানি থেকে বায়ুতে বেরোনোর সময় অভিলম্ব থেকে দূরে বেঁকে যায়। চোখ ও মস্তিষ্ক আলোকে সোজা পথে এসেছে ধরে নিয়ে রশ্মিগুলোর পেছনের বর্ধিতাংশ যেখানে মিলিত হয় সেখানেই বিন্দুটিকে দেখে — এই আপাত অবস্থান আসল গভীরতার চেয়ে ওপরে থাকে। সম্পর্ক: আপাত গভীরতা = আসল গভীরতা/μ (লম্বভাবে দেখলে; পানির জন্য μ = 4/3 বলে আপাত গভীরতা আসলের 3/4 অংশ)। পানিতে দাঁড়ানো লাঠি বাঁকা দেখা বা মুদ্রা রাখা বাটিতে পানি ঢাললে মুদ্রা আবার দৃশ্যমান হওয়াও একই কারণে। ব্যবহারিক সতর্কতা: সাঁতার না জানলে পুকুরের গভীরতা চোখের আন্দাজে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক — আসল গভীরতা সবসময় বেশি।

প্রশ্ন 06: প্রিজমে আলোর বিচ্যুতি ও বিক্ষেপণের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: বিচ্যুতি (deviation) হলো প্রিজম পেরিয়ে নির্গত রশ্মি মূল দিক থেকে মোট কতটা কোণে বেঁকে গেল — প্রতিটি বর্ণের জন্যই বিচ্যুতি ঘটে, একরঙা আলোতেও। বিক্ষেপণ (dispersion) হলো সাদা আলোর বিভিন্ন বর্ণে ভেঙে যাওয়া — কারণ প্রতিসরণাঙ্ক বর্ণভেদে ভিন্ন (μ_বেগুনি > μ_লাল), ফলে প্রতিটি বর্ণের বিচ্যুতি আলাদা হয় ও বর্ণালি তৈরি হয়। অর্থাৎ বিচ্যুতি হলো একটি রশ্মির দিক-পরিবর্তন, বিক্ষেপণ হলো বিচ্যুতির বর্ণ-নির্ভরতার ফলাফল — যৌগিক আলো ছাড়া বিক্ষেপণ দেখা যায় না, বিচ্যুতি দেখা যায়। কৌণিক বিক্ষেপণ = বেগুনি ও লালের বিচ্যুতির পার্থক্য। প্রিজমের উপাদান বাছাইয়ে দুটোই বিবেচনা করা হয় — ফ্লিন্ট কাচে বিক্ষেপণ বেশি বলে বর্ণালি তৈরিতে তা পছন্দের।

প্রশ্ন 07: ন্যূনতম বিচ্যুতি অবস্থানে প্রিজম রেখে প্রতিসরণাঙ্ক মাপা হয় কেন?

উত্তর: আপতন কোণ বদলালে বিচ্যুতি প্রথমে কমে একটি সর্বনিম্ন মানে পৌঁছে আবার বাড়ে; এই ন্যূনতম বিচ্যুতি (δ_m) অবস্থানে প্রিজমের ভেতরের রশ্মি ভূমির সমান্তরাল থাকে এবং প্রতিসম পথে যায় (আপতন কোণ = নির্গমন কোণ)। এই অবস্থানে প্রতিসরণাঙ্কের পরিচ্ছন্ন সূত্র পাওয়া যায়: μ = sin((A + δ_m)/2)/sin(A/2) — শুধু প্রিজম কোণ A ও δ_m মাপলেই চলে। ব্যবহারিক সুবিধা আরও আছে: δ_m-এর কাছাকাছি আপতন কোণের সামান্য ভুলে বিচ্যুতি প্রায় বদলায় না (লেখচিত্রের সর্বনিম্ন বিন্দুতে ঢাল শূন্য), ফলে পরিমাপ সবচেয়ে নির্ভুল হয়। তাই স্পেকট্রোমিটার পরীক্ষায় প্রিজমকে এই অবস্থানে সেট করাই নিয়ম।

প্রশ্ন 08: রংধনু কীভাবে সৃষ্টি হয়?

উত্তর: বৃষ্টির পর বাতাসে ভাসমান অসংখ্য পানির ফোঁটার প্রতিটিতে সূর্যের আলো ঢোকার সময় প্রতিসরণ ও বিক্ষেপণে বর্ণে ভেঙে যায়, ফোঁটার পেছনের পৃষ্ঠে একবার পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলিত হয়, তারপর বেরোনোর সময় আবার প্রতিসরিত হয়ে বিক্ষেপণ আরও স্পষ্ট হয়। প্রতিটি বর্ণ নির্দিষ্ট কোণে (লাল প্রায় 42°, বেগুনি প্রায় 40°) বেরিয়ে আসে বলে পর্যবেক্ষকের চোখে আকাশে ধনুকাকার বর্ণালি দেখা যায় — সূর্যের বিপরীত দিকে, সূর্য পেছনে থাকলেই রংধনু দেখা যায়। ভিন্ন ভিন্ন ফোঁটা থেকে ভিন্ন বর্ণ আসে — ওপরের ফোঁটা থেকে লাল, নিচের থেকে বেগুনি। দ্বিতীয় রংধনুতে ফোঁটার ভেতরে দুইবার প্রতিফলন ঘটে বলে বর্ণের ক্রম উল্টে যায় ও উজ্জ্বলতা কমে। অর্থাৎ রংধনু প্রতিসরণ + বিক্ষেপণ + পূর্ণ প্রতিফলন — তিনটি ঘটনার যৌথ প্রদর্শনী।

প্রশ্ন 09: লেন্সকে পানিতে ডুবালে এর ক্ষমতা কমে যায় কেন?

উত্তর: লেন্সের ক্ষমতা নির্ভর করে লেন্সের উপাদান ও চারপাশের মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যের ওপর: সূত্রে পদ থাকে (μ_লেন্স/μ_মাধ্যম − 1)। বায়ুতে কাচের (μ = 1.5) জন্য এই পদ ≈ 0.5; কিন্তু পানিতে (μ = 1.33) ডুবালে আপেক্ষিক প্রতিসরণাঙ্ক হয় 1.5/1.33 ≈ 1.13, পদটি কমে ≈ 0.13 — অর্থাৎ প্রতিসরণের ক্ষমতাই দুর্বল হয়ে যায়, ফোকাস দূরত্ব বেড়ে প্রায় চার গুণ ও ক্ষমতা কমে যায়। চরম ক্ষেত্রে মাধ্যমের μ লেন্সের μ-এর সমান হলে লেন্স অদৃশ্য হয়ে যায় (কোনো প্রতিসরণই হয় না), আর মাধ্যম ঘনতর হলে উত্তল লেন্স অবতলের মতো আচরণ করতে থাকে। আমাদের চোখের ক্ষেত্রেও একই হিসাব — পানির নিচে খালি চোখে ঝাপসা দেখার কারণ চোখের কর্নিয়ার প্রতিসরণ ক্ষমতা পানিতে প্রায় হারিয়ে যায়; গগলস পরে বায়ুস্তর ফিরিয়ে আনলেই পরিষ্কার।

প্রশ্ন 10: লেন্সের ক্ষমতা বলতে কী বোঝ? সংস্পর্শে থাকা দুটি লেন্সের ক্ষমতা যোগ হয় কেন?

উত্তর: লেন্সের ক্ষমতা P = 1/f (f মিটারে) — লেন্স আলোকে কতটা জোরে বাঁকাতে/মেলাতে পারে তার মাপ, একক ডায়াপ্টার (D)। উত্তল লেন্সের ক্ষমতা ধনাত্মক, অবতলের ঋণাত্মক। সংস্পর্শে থাকা দুটি পাতলা লেন্সের ক্ষেত্রে প্রথম লেন্সের তৈরি করা বিচ্যুতির ওপর দ্বিতীয় লেন্স আরও বিচ্যুতি যোগ করে — মাঝখানে দূরত্ব না থাকায় প্রতিবিম্ব-বস্তুর হস্তান্তর সরাসরি হয়, ফলে মোট বিচ্যুতি দুটির যোগফল, অর্থাৎ 1/F = 1/f₁ + 1/f₂ বা P = P₁ + P₂। এই সরল যোগের সুবিধা নেয় চক্ষু চিকিৎসকেরা: ট্রায়াল লেন্স যোগ-বিয়োগ করে রোগীর জন্য সঠিক ক্ষমতা বের করা হয়। দূরত্ব থাকলে সূত্র বদলে যায় — ক্যামেরা ও টেলিস্কোপের বহু-লেন্স নকশায় সেই জটিল হিসাবই লাগে।

প্রশ্ন 11: নিকটদৃষ্টি ত্রুটি অবতল লেন্স দিয়ে, দূরদৃষ্টি উত্তল লেন্স দিয়ে সারানো হয় কেন?

উত্তর: নিকটদৃষ্টি (মায়োপিয়া) ত্রুটিতে চক্ষুগোলক লম্বাটে বা লেন্স বেশি শক্তিশালী হওয়ায় দূরের বস্তুর প্রতিবিম্ব রেটিনার সামনে তৈরি হয় — দূরের জিনিস ঝাপসা। অবতল (বিক্ষেপী) লেন্স রশ্মিগুলোকে আগেভাগে ছড়িয়ে দেয়, ফলে চোখের লেন্সের মোট অভিসরণ কমে প্রতিবিম্ব পিছিয়ে ঠিক রেটিনায় পড়ে। দূরদৃষ্টি (হাইপারমেট্রোপিয়া) ত্রুটিতে উল্টোটা — কাছের বস্তুর প্রতিবিম্ব রেটিনার পেছনে পড়তে চায়; উত্তল (অভিসারী) লেন্স অতিরিক্ত অভিসরণ জোগান দিয়ে প্রতিবিম্ব এগিয়ে রেটিনায় আনে। দুটি ক্ষেত্রেই চশমার লেন্স চোখের লেন্সের ঘাটতি/বাড়তির ঠিক পরিপূরক হিসেবে কাজ করে — ত্রুটি সারায় না, পুষিয়ে দেয়; ক্ষমতার চিহ্নও তাই বিপরীত: মায়োপিয়ার প্রেসক্রিপশনে বিয়োগ, হাইপারমেট্রোপিয়ায় যোগ।

প্রশ্ন 12: চোখের প্রতিবিম্ব রেটিনায় উল্টো তৈরি হলেও আমরা সোজা দেখি কেন?

উত্তর: চোখ মূলত একটি উত্তল লেন্স ব্যবস্থা — লেন্সের স্বভাব অনুযায়ী রেটিনায় বাস্তব ও উল্টো প্রতিবিম্বই তৈরি হয়, যেমন ক্যামেরার সেন্সরেও উল্টো প্রতিবিম্ব পড়ে। কিন্তু “দেখা” চোখের কাজ নয় — প্রতিবিম্ব থেকে স্নায়ু সংকেত মস্তিষ্কে যায় এবং মস্তিষ্ক সেই সংকেতকে শৈশবের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে সোজা জগৎ উপস্থাপন করে। ওপর-নিচের ধারণাই আসে মাধ্যাকর্ষণ ও স্পর্শের সঙ্গে দৃষ্টির মিলিয়ে নেওয়া থেকে। পরীক্ষায় দেখা গেছে উল্টো-দেখানো চশমা কয়েকদিন পরলে মস্তিষ্ক আবার অভিযোজিত হয়ে সব সোজা দেখতে শুরু করে — চশমা খুললে আরও কিছুক্ষণ উল্টো লাগে। অর্থাৎ রেটিনার উল্টো প্রতিবিম্ব কোনো সমস্যাই নয়; উপলব্ধি মস্তিষ্কের নির্মাণ।

প্রশ্ন 13: গাড়ির পেছনে দেখার আয়না হিসেবে উত্তল আয়না ব্যবহার করা হয় কেন?

উত্তর: উত্তল আয়না সবসময় খাড়া, ছোট ও অবাস্তব প্রতিবিম্ব দেয় এবং সবচেয়ে বড় সুবিধা — এর দৃষ্টিক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত: একই আকারের সমতল আয়নার চেয়ে অনেক বেশি কোণ থেকে আসা রশ্মি এটি চোখে পৌঁছে দিতে পারে। চালকের কাছে পেছনের বিস্তৃত দৃশ্য পাওয়াটাই প্রধান — কোন গাড়ি পাশে বা পেছনে আছে তা জানা। মূল্য দিতে হয় দূরত্বের ধারণায়: প্রতিবিম্ব ছোট হয় বলে বস্তু আসল দূরত্বের চেয়ে দূরে মনে হয় — তাই অনেক আয়নায় সতর্কবাণী লেখা থাকে “বস্তুসমূহ আয়নায় দেখা দূরত্বের চেয়ে কাছে আছে”। ছোটখাট দোকান ও রাস্তার অন্ধ বাঁকেও নিরাপত্তা আয়না হিসেবে উত্তল আয়নাই বসানো হয় একই কারণে। সমতল আয়না সঠিক মাপ দিলেও তার দৃষ্টিক্ষেত্র খুব সরু — গাড়ির ক্ষেত্রে সেটা বিপজ্জনক।

প্রশ্ন 14: প্রতিসরণে আলোর বেগ ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য বদলায় কিন্তু কম্পাঙ্ক বদলায় না কেন?

উত্তর: কম্পাঙ্ক নির্ধারিত হয় উৎস দিয়ে — প্রতি সেকেন্ডে কতটি তরঙ্গশীর্ষ সীমানায় এসে পৌঁছাচ্ছে। সীমানায় তরঙ্গ জমা হতে বা হারিয়ে যেতে পারে না — অপর মাধ্যমেও প্রতি সেকেন্ডে ঠিক ততটিই তরঙ্গশীর্ষ বেরিয়ে যেতে হবে, নইলে সীমানায় তরঙ্গের “জট” তৈরি হতো। তাই f দুই মাধ্যমেই সমান থাকে। বেগ বদলায় মাধ্যমের ধর্মে (v = c/μ)। সম্পর্ক v = fλ-তে f ধ্রুব থাকায় λ বেগের অনুপাতে বদলে যায়: λ_মাধ্যম = λ_শূন্য/μ। বর্ণের পরিচিতি কম্পাঙ্কে বাঁধা বলেই পানিতে ডুব দিলেও রঙ একই দেখি, যদিও তরঙ্গদৈর্ঘ্য বদলে গেছে। একই যুক্তি শব্দ তরঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য — মাধ্যম বদলালে সুরের তীক্ষ্ণতা নয়, বেগ বদলায়।

প্রশ্ন 15: বেগুনি আলোর বিচ্যুতি লাল আলোর চেয়ে বেশি হয় কেন?

উত্তর: মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভরশীল (কোশির সম্পর্ক): তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট, μ তত বেশি — বেগুনির λ সবচেয়ে ছোট বলে কাচে তার μ সবচেয়ে বড় (প্রায় 1.53), লালের সবচেয়ে ছোট (প্রায় 1.51)। প্রিজমের বিচ্যুতি δ ≈ (μ − 1)A — μ বেশি মানেই বেশি বাঁক। ফলে সাদা আলো প্রিজমে ঢুকলে বেগুনি সবচেয়ে বেশি ও লাল সবচেয়ে কম বেঁকে বর্ণালি ছড়িয়ে পড়ে — এটাই বিক্ষেপণের মূলে। একই কারণে রংধনুর বাইরের প্রান্ত লাল ও ভেতরের প্রান্ত বেগুনি থাকে। মনে রাখো: লাল আলো “শক্তিশালী” নয় বলেই কম বাঁকে এমন নয় — ব্যাপারটা মাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার বর্ণ-নির্ভরতা, স্বাভাবিক বিক্ষেপণের ক্ষেত্রে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে মাধ্যমের ইলেকট্রনগুলোর অনুরণন বেশি হয়।

প্রশ্ন 16: লেন্সে বর্ণাপেরণ (chromatic aberration) ঘটে কেন?

উত্তর: লেন্স আসলে একরকম দুই-প্রিজমের সমষ্টি হিসেবে ভাবা যায় — প্রতিসরণাঙ্ক বর্ণভেদে ভিন্ন হওয়ায় একটিমাত্র লেন্স বিভিন্ন বর্ণকে বিভিন্ন বিন্দুতে ফোকাস করে: বেগুনি আলো বেশি বেঁকে কাছে, লাল কম বেঁকে দূরে ফোকাস পায়। ফলে সাদা আলোর বস্তুর প্রতিবিম্বে প্রান্তে রঙের ঝাপসা কিনারা দেখা যায় — এটিই বর্ণাপেরণ। প্রতিকার: দুটি ভিন্ন কাচের (ক্রাউন ও ফ্লিন্ট) উত্তল-অবতল লেন্স জোড়া লাগিয়ে অ্যাক্রোমেটিক জোড় বানানো — এক লেন্সের বিক্ষেপণ অন্যটি প্রায় বাতিল করে দেয়, কিন্তু অভিসরণ পুরোপুরি হারায় না। ভালো ক্যামেরা ও টেলিস্কোপ লেন্সে এই জোড়ের বহু স্তর থাকে। প্রতিফলক টেলিস্কোপে (আয়না ব্যবহারে) বর্ণাপেরণ একদমই থাকে না — কারণ প্রতিফলনে বর্ণ-নির্ভরতা নেই।

প্রশ্ন 17: সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে লাল ও সামান্য চ্যাপ্টা দেখায় কেন?

উত্তর: সূর্যাস্তে সূর্যের আলোকে বায়ুমণ্ডলের অনেক পুরু স্তর ভেদ করে আসতে হয়। এই দীর্ঘ পথে বিক্ষেপণে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল-বেগুনি আলো প্রায় পুরোটাই ছড়িয়ে যায় — পৌঁছায় মূলত লাল-কমলা অংশ, তাই সূর্য লাল দেখায় (বিক্ষেপণ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চতুর্থ ঘাতের ব্যস্তানুপাতিক)। চ্যাপ্টা দেখার কারণ প্রতিসরণ: সূর্যের নিচের প্রান্তের আলো ওপরের প্রান্তের তুলনায় ঘনতর বায়ুস্তর দিয়ে আসায় বেশি বেঁকে ওপরে ওঠে — ফলে উল্লম্ব ব্যাস সঙ্কুচিত মনে হয়, অনুভূমিক ব্যাস অপরিবর্তিত থাকে। একই প্রতিসরণের কারণে সূর্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের চেয়ে প্রায় 2 মিনিট আগে “ওঠে” ও 2 মিনিট পরে “ডোবে” — আসলে সূর্য জ্যামিতিক দিগন্তের নিচে চলে গেলেও আমরা তাকে দেখতে পাই। শেষের এই বাড়তি দেখাও প্রতিসরণেরই কীর্তি।

প্রশ্ন 18: সরল অণুবীক্ষণ ও যৌগিক অণুবীক্ষণের মধ্যে পার্থক্য লেখো।

উত্তর: সরল অণুবীক্ষণ (ম্যাগনিফাইং গ্লাস) হলো একটি মাত্র ছোট ফোকাস-দূরত্বের উত্তল লেন্স — বস্তুকে ফোকাসের ভেতরে রেখে বড়, খাড়া, অবাস্তব প্রতিবিম্ব দেখা যায়; বিবর্ধন সাধারণত 20 গুণের বেশি পাওয়া যায় না। যৌগিক অণুবীক্ষণে দুটি লেন্স-ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে: অভিলক্ষ্য (objective) লেন্স প্রথমে বড় বাস্তব প্রতিবিম্ব তৈরি করে, তারপর চোখের লেন্স (eyepiece) সেটিকে সরল অণুবীক্ষণের মতো আবার বিবর্ধিত করে দেখায় — মোট বিবর্ধন দুটি বিবর্ধনের গুণফল, হাজার গুণ পর্যন্ত পৌঁছায়। দুটোর ফোকাস দূরত্বই ছোট রাখা হয় বিবর্ধন বাড়াতে। বাণিজ্য: বিবর্ধন যত বেশি, দৃষ্টিক্ষেত্র ও উজ্জ্বলতা তত কম — তাই অণুজীব দেখতে যৌগিক, ঘড়ির যন্ত্রাংশ দেখতে সরল লেন্সই যথেষ্ট।

প্রশ্ন 19: জ্যোতির্বিজ্ঞান টেলিস্কোপে বস্তুনিষ্ঠ লেন্সের ফোকাস দূরত্ব বড় রাখা হয় কেন?

উত্তর: টেলিস্কোপের কৌণিক বিবর্ধন M = f_o/f_e — অভিলক্ষ্যের ফোকাস দূরত্ব যত বড়, বিবর্ধন তত বেশি। দূরের নক্ষত্র থেকে আসা রশ্মি প্রায় সমান্তরাল; বড় f_o হলে অভিলক্ষ্যের ফোকাস তলে তৈরি প্রতিবিম্বটি বড় হয়, ফলে একই eyepiece দিয়ে সেটি বেশি বিবর্ধনে দেখা যায়। বড় ব্যাসের অভিলক্ষ্যের বাড়তি সুবিধা — বেশি আলো সংগ্রহ করে ম্লান নক্ষত্রও উজ্জ্বল দেখায়, আর বিচ্ছেদন ক্ষমতাও বাড়ে (কাছাকাছি দুই নক্ষত্র আলাদা বোঝা যায়)। মূল্য দিতে হয় যন্ত্রের দৈর্ঘ্যে: নল লম্বা হয়ে যায়। এই কারণেই প্রতিসরণ টেলিস্কোপের যুগ পার হয়ে বড় বড় প্রতিফলক (আয়না) টেলিস্কোপ এসেছে — আয়না বানানো সহজ, বর্ণাপেরণও নেই।

প্রশ্ন 20: সমতল আয়নায় পার্শ্বীয় উল্টানো (lateral inversion) ঘটে কেন?

উত্তর: সমতল আয়নায় প্রতিবিম্ব তৈরি হয় আয়নার পেছনে, বস্তুর সমান দূরত্বে, খাড়া ও সমান আকারে — কিন্তু সামনে-পেছনে উল্টে যায়: আয়নার দিকে মুখ করা অংশটি প্রতিবিম্বেও সামনে আসে। আমরা আমাদের ডান-বাম ধারণা নিজেদের শরীর থেকে নিই, তাই সামনে-পেছনের এই উল্টানোটা আমাদের কাছে ডান-বাম বদলে গেছে বলে মনে হয় — ডান হাতের প্রতিবিম্ব বাম হাতের মতো দেখায়, লেখা উল্টো পড়া যায় না। অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে “AMBULANCE” উল্টো করে লেখা থাকে ঠিক এই কারণে — সামনের গাড়ির আয়নায় তা সোজা পড়া যায়। মনে রাখো, আয়না আসলে ওপর-নিচ বা ডান-বাম কোনোটাই উল্টায় না — সে উল্টায় গভীরতার দিক (সামনে-পেছনে)।

প্রশ্ন 21: দুটি প্রিজম বিপরীতভাবে বসালে সাদা আলো আবার ফিরে আসে — এ থেকে কী প্রমাণিত হয়?

উত্তর: নিউটনের এই পরীক্ষায় প্রথম প্রিজম সাদা আলোকে বর্ণালিতে ভেঙে দেয়; দ্বিতীয় প্রিজম বিপরীতমুখী (উল্টো) বসালে বর্ণগুলো আবার মিশে সাদা আলো ফিরে আসে। প্রমাণিত হয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য: (১) বর্ণগুলো কাচ/প্রিজম তৈরি করে না — সেগুলো সাদা আলোর মধ্যেই আগে থেকে ছিল, প্রিজম শুধু আলাদা করে; (২) বিক্ষেপণ একটি প্রত্যাবর্তী (reversible) প্রক্রিয়া — আলাদা হওয়া বর্ণ আবার যুক্ত হলে মূল সাদাই পাওয়া যায়। দ্বিতীয় প্রিজম প্রথমটির বিচ্যুতিও প্রায় বাতিল করে দেয় — এই জোড়ের ধারণা থেকেই পরবর্তীতে বিচ্যুতিশূন্য বিক্ষেপণ ও বিক্ষেপণশূন্য বিচ্যুতির প্রিজম-জোড়ের নকশা এসেছে। পরীক্ষাটি আলোর যৌগিক স্বভাবের ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে বিখ্যাত।

প্রশ্ন 22: অবতল লেন্স সবসময় অবাস্তব প্রতিবিম্ব তৈরি করে কেন?

উত্তর: অবতল লেন্স বিক্ষেপী — সমান্তরাল রশ্মি এর মধ্য দিয়ে গেলে ছড়িয়ে এমনভাবে নির্গত হয় যেন তারা লেন্সের একই পাশের ফোকাস বিন্দু থেকে আসছে। যেকোনো অবস্থানের বস্তুর রশ্মিই লেন্স পেরিয়ে ছড়িয়ে যায়, ফলে রশ্মিগুলো অপর পাশে কখনোই সত্যিকারে মিলিত হয় না — তাদের পেছনের বর্ধিতাংশ বস্তুর দিকের পাশে মিলিত হয়ে খাড়া, ছোট, অবাস্তব প্রতিবিম্ব তৈরি করে। উত্তল লেন্সে বস্তু ফোকাসের বাইরে রাখলে বাস্তব প্রতিবিম্ব পাওয়া সম্ভব কারণ সে রশ্মি মেলাতে পারে; অবতল লেন্সের সেই সক্ষমতাই নেই — তার ফোকাস দূরত্বই ঋণাত্মক। এই কারণে অবতল লেন্সের প্রতিবিম্ব পর্দায় ধরা যায় না, কিন্তু দরজার পিপ-হোলে বিস্তৃত দৃশ্য পেতে এর অবাস্তব, ছোট, খাড়া প্রতিবিম্বই কাজে লাগে।


জ্যামিতিক আলোকবিজ্ঞানের সারসংক্ষেপ: প্রতিসরণের দিক-বাঁকই সবকিছুর মূলে — সেখান থেকেই আপাত গভীরতা, মরীচিকা, রংধনু, আবার লেন্সের ক্ষমতা ও চোখের ত্রুটির সমাধান। পরের পোস্টে আসছে সপ্তম অধ্যায় — ভৌত আলোকবিজ্ঞান-এর অনুধাবনমূলক ম্যারাথন।

এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের ষষ্ঠ অধ্যায় জ্যামিতিক আলোকবিজ্ঞান-এর সব গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর এক পোস্টে — পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন, অপটিক্যাল ফাইবার, প্রিজম ও লেন্সসহ মোট ২২টি প্রশ্ন।
Picture of Rashed Rion
Rashed Rion

Physics, University of Chittagong

Facebook
Scroll to Top