এইচএসসি ভৌত আলোকবিজ্ঞান অনুধাবনমূলক ম্যারাথন

পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের সপ্তম অধ্যায় — ভৌত আলোকবিজ্ঞান। আকাশ নীল কেন, সাবানের বুদবুদে রঙের খেলা কেন, দুটি আলাদা বাল্ব দিয়ে ব্যতিচার হয় না কেন — এই অধ্যায়ের অনুধাবনমূলক প্রশ্নগুলো আলোর তরঙ্গ স্বভাব, ব্যতিচার, অপবর্তন ও সমবর্তন থেকে আসে। এই পোস্টে অধ্যায়ের সব গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর একসাথে সাজানো হয়েছে — বোর্ড পরীক্ষা ও কলেজ টেস্ট পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে। প্রতিটি উত্তর ২ নম্বরের উপযোগী করে সংক্ষিপ্ত ও ধারণা-নির্ভর করে লেখা।

অনুধাবনমূলক প্রশ্নের তালিকা


প্রশ্ন 01: হাইগেনসের নীতি বলতে কী বোঝ? এটি দিয়ে প্রতিসরণ কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

উত্তর: হাইগেনসের নীতি বলে: তরঙ্গমুখের প্রতিটি বিন্দুকে নতুন গৌণ তরঙ্গিকার (wavelet) উৎস ধরা যায়, যেগুলো তরঙ্গের বেগে সামনের দিকে ছড়ায়; যেকোনো পরবর্তী মুহূর্তের নতুন তরঙ্গমুখ হলো সব গৌণ তরঙ্গিকার সাধারণ স্পর্শক তল। প্রতিসরণের ব্যাখ্যা: তরঙ্গমুখ ঘন মাধ্যমে ঢুকলে বেগ কমে যায় — তরঙ্গমুখের যে প্রান্ত আগে সীমানায় পৌঁছায় সে ধীর গতিতে এগোয়, অপর প্রান্ত দ্রুত গতিতে সীমানা পর্যন্ত চলে আসে; ফলে তরঙ্গমুখটি ঘুরে যায় এবং তরঙ্গ অভিলম্বের দিকে বেঁকে এগোয়। এই জ্যামিতি থেকেই স্নেলের সূত্র (sin i/sin r = v₁/v₂ = ধ্রুবক) সরাসরি বেরিয়ে আসে — প্রতিসরণের সূত্রকে তরঙ্গচিত্রে প্রতিষ্ঠা দেওয়াই হাইগেনসের কীর্তি। ফ্রেনেল পরবর্তীতে এই নীতিতে ব্যতিচার যোগ করে তা সম্পূর্ণ করেন।

প্রশ্ন 02: সুসংগত উৎস বলতে কী বোঝ? দুটি পৃথক বাল্ব দিয়ে ব্যতিচার পটি পাওয়া যায় না কেন?

উত্তর: দুটি উৎস সুসংগত হয় যদি তাদের কম্পাঙ্ক সমান হয় এবং তাদের দশা পার্থক্য সবসময় ধ্রুব থাকে। স্থায়ী ব্যতিচার পটি পেতে হলে পর্দার প্রতিটি বিন্দুতে দশা পার্থক্য সময়ে ধ্রুব থাকতে হবে — নইলে উজ্জ্বল-অন্ধকার অবস্থান প্রতিক্ষণ বদলাতে থাকবে। দুটি পৃথক বাল্বের পরমাণুগুলো স্বতন্ত্রভাবে, এলোমেলো দশায় আলো ছাড়ে — প্রতি প্রায় 10⁻⁸ সেকেন্ডে দশা সম্পর্ক পুরোপুরি বদলে যায়, ফলে পটি-বিন্যাস চোখের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্রুত বদলায় এবং আমরা দেখি সুষম আলো। এ কারণেই ইয়ং একই উৎসকে দুটি চিড় দিয়ে ভাগ করে সুসংগত জোড় তৈরি করেন — দুটি চিড় একই তরঙ্গমুখ থেকে আসায় দশা পার্থক্য সবসময় ধ্রুব থাকে। লেজার ব্যতিক্রমীভাবে দুটি আলাদা উৎসকেও সুসংগতের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন 03: ইয়ং-এর দ্বি-চিড় পরীক্ষায় সব পটির প্রস্থ সমান হয় কেন?

উত্তর: পটি প্রস্থ β = λD/d — এখানে কোনো রাশিই পটি ক্রমের (n) ওপর নির্ভর করে না। কারণ পথ পার্থক্য পর্দা বরাবর প্রায় রৈখিক হারে বাড়ে: পরপর দুটি উজ্জ্বল পটির জন্য পথ পার্থক্য ঠিক এক তরঙ্গদৈর্ঘ্য করে বাড়ে (nλ থেকে (n+1)λ), এবং রৈখিক হার একই থাকায় পর্দায় তাদের দূরত্বও প্রতিবার সমান হয়। ক্ষুদ্র কোণের আসন্নীকরণে (sinθ ≈ tanθ) এই সমতা ভালোভাবে খাটে — বড় কোণে সামান্য বিচ্যুতি এলেও উপেক্ষণীয়। বিপরীতে একক চিড় অপবর্তনের পটিগুলোর প্রস্থ সমান হয় না — সেখানে কেন্দ্রীয় পটি দ্বিগুণ প্রশস্ত। β সূত্রের আরেক তথ্য: পটি প্রস্থ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক — লাল আলোর পটি বেগুনির চেয়ে ছড়ানো হয়।

প্রশ্ন 04: দ্বি-চিড়ের ব্যবধান বাড়ালে পটি সংকুচিত হয় কেন?

উত্তর: পটি প্রস্থ β = λD/d — d বাড়লে β কমে। ভৌত কারণ: দুটি চিড় দূরে সরে গেলে নির্দিষ্ট পথ পার্থক্য (যেমন λ) পেতে প্রয়োজনীয় কোণ θ ছোট হয়ে যায় — কারণ পথ পার্থক্য d·sinθ; d দ্বিগুণ হলে একই পথ পার্থক্যের জন্য sinθ অর্ধেক হতে হয়, ফলে পরপর পটিগুলো কেন্দ্রের দিকে কাছাকাছি জড়ো হয়। উল্টোদিকে চিড় খুব কাছাকাছি আনলে পটি এত ছড়িয়ে যায় যে পুরো পর্দায় মাত্র কয়েকটি দেখা যায়। এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে অজানা λ মাপা হয়: সহজে মাপা যায় এমন β পেতে d যথাযথ বাছাই করা হয় — পরীক্ষার ব্যবস্থা গোছানোর সময় এই ভারসাম্যটাই মূল। মনে রাখো D (চিড়-পর্দা দূরত্ব) বাড়ালে বিপরীতভাবে পটি প্রসারিত হয়।

প্রশ্ন 05: সাদা আলো ব্যবহার করলে কেন্দ্রীয় পটি সাদা কিন্তু পার্শ্বীয় পটিগুলো রঙিন হয় কেন?

উত্তর: কেন্দ্রীয় অবস্থানে (n = 0) সব বর্ণের জন্যই পথ পার্থক্য শূন্য — সব বর্ণের গঠনমূলক ব্যতিচার একই জায়গায় পড়ে, মিশে সাদা উজ্জ্বল পটি তৈরি হয়। কিন্তু প্রথম, দ্বিতীয় ক্রমের পটির অবস্থান বর্ণভেদে আলাদা, কারণ β ∝ λ: লালের পটি (λ বড়) বাইরে, বেগুনির (λ ছোট) ভেতরে — ফলে প্রতিটি পার্শ্বীয় পটির ভেতরের প্রান্ত বেগুনি ও বাইরের প্রান্ত লাল রঙা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, সাদা থাকে না। ক্রম বাড়লে পটিগুলো পরস্পরের ওপর এসে পড়ে বর্ণগুলো মিশে যায় — দূরের পটিতে আর আলাদা রঙ চেনা যায় না, ধূসরাভ আলো দেখা যায়। এই ধর্ম কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রীয় শূন্য-ক্রম পটি শনাক্ত করা হয় — পরীক্ষায় পটির সঠিক গণনা শুরুর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

প্রশ্ন 06: একটি চিড়ের সামনে পাতলা কাচের পাত রাখলে ব্যতিচার পটি সরে যায় কেন?

উত্তর: কাচের পাত (বেধ t, প্রতিসরণাঙ্ক μ) এক চিড়ের পথে রাখলে ওই পথের আলোকীয় দৈর্ঘ্য বেড়ে যায় (μ − 1)t পরিমাণ — অর্থাৎ ওই চিড়ের তরঙ্গ অতিরিক্ত পথ পার্থক্য নিয়ে আসে। কেন্দ্রীয় উজ্জ্বল পটির শর্ত “পথ পার্থক্য = 0” তখন আর আগের কেন্দ্রে থাকে না; পুরো পটি-বিন্যাসটি কাচ রাখা চিড়ের দিকে Δx = (D/d)(μ − 1)t পরিমাণ সরে যায় যাতে জ্যামিতিক পথ পার্থক্য অপটিক্যাল বাড়তিটাকে পুষিয়ে দেয়। পটির আকার বা প্রস্থ বদলায় না, শুধু পুরো বিন্যাসের স্থানান্তর হয়। এই পটি-সরণ মেপেই পাতলা পাতের বেধ বা প্রতিসরণাঙ্ক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করা যায় — মাইকেলসন ইন্টারফেরোমিটারের কার্যপদ্ধতির ভিত্তিও এটাই।

প্রশ্ন 07: একক চিড় অপবর্তনে কেন্দ্রীয় উজ্জ্বল পটি সবচেয়ে প্রশস্ত ও উজ্জ্বল হয় কেন?

উত্তর: একক চিড়কে অনেকগুলো ক্ষুদ্র গৌণ উৎসের সমারোহ ভাবা যায়। কেন্দ্রীয় দিকে (θ = 0) সব গৌণ তরঙ্গ একই দশায় পৌঁছায় — পূর্ণ গঠনমূলক ব্যতিচারে সর্বোচ্চ তীব্রতা, এবং এখানে কোনো ধ্বংসাত্মক জোড় তৈরি হয় না। প্রথম অবম (minimum) আসে যখন চিড়ের দুই অর্ধেক থেকে আসা তরঙ্গের পথ পার্থক্য λ/2-এর জোড়া-ধ্বংস তৈরি করে (a·sinθ = λ)। কেন্দ্রীয় পটির প্রস্থ দুই পাশের প্রথম অবম পর্যন্ত — অন্যান্য পার্শ্বীয় পটির দ্বিগুণ, কারণ সেগুলো পরপর দুটি অবমের মাঝখানে এক একক “ধাপে” বন্দী। পার্শ্বীয় পটিগুলোতে চিড়ের শুধু একটি ভগ্নাংশের তরঙ্গই অবাতিল থাকে, বাকি জোড়ায় জোড়ায় কেটে যায় — তাই তীব্রতা দ্রুত কমে (প্রথম পার্শ্বীয় পটি কেন্দ্রীয়ের মাত্র প্রায় 4.5%)। ফলে বিন্যাসটি: মাঝখানে বিশাল উজ্জ্বল পটি, পাশে দ্রুত ম্লান হয়ে যাওয়া সরু পটি।

প্রশ্ন 08: শব্দ তরঙ্গ দরজা দিয়ে সহজে বাঁকলেও আলো বাঁকে না কেন?

উত্তর: অপবর্তনের মাত্রা নির্ভর করে বাধা/ছিদ্রের আকার a ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য λ-এর অনুপাতের ওপর — লক্ষণীয় অপবর্তন পেতে হলে a ≈ λ বা তার কাছাকাছি হতে হয়। শব্দের λ প্রায় 0.02–17 m — দরজা বা জানালার আকারের (প্রায় 1 m) সঙ্গে তুলনীয়, তাই শব্দ ঘরের বাইরে গিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে: আমরা দেখা না পেলেও শুনতে পাই। আলোর λ মাত্র 4–7 × 10⁻⁷ m — দরজার তুলনায় লক্ষ গুণ ছোট, ফলে বাঁক এত নগণ্য যে আলো প্রায় সম্পূর্ণ সরলরেখায় চলে ও তীক্ষ্ণ ছায়া তৈরি করে। আলোর অপবর্তন দেখতে হলে λ-মাত্রার চিড় লাগে — চুলের মতো সরু ফাঁক বা গ্রেটিংয়ে তা দেখা যায়। অর্থাৎ পার্থক্য তরঙ্গের স্বভাবে নয়, আকারের স্কেলে — আলোও তরঙ্গ, শুধু তার λ আমাদের দৈনন্দিন বাধার তুলনায় অস্বাভাবিক ছোট।

প্রশ্ন 09: সাবানের বুদবুদ ও পানির ওপর তেলের স্তরে রঙ দেখা যায় কেন?

উত্তর: পাতলা স্বচ্ছ স্তরের দুটি পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত আলো পরস্পরের সঙ্গে ব্যতিচার করে। ওপরের পৃষ্ঠে (ঘন মাধ্যমে প্রতিফলন) π দশা পরিবর্তন ঘটে, নিচের পৃষ্ঠে ঘটে না — এই অর্ধেক-তরঙ্গের বাড়তি পার্থক্যসহ মোট পথ পার্থক্য 2μt·cos r কোনো বর্ণের জন্য গঠনমূলক হলে সেই বর্ণ উজ্জ্বল দেখায়, অন্য বর্ণ ধ্বংসাত্মক হয়ে মুছে যায়। স্তরের বেধ (t) জায়গায় জায়গায় ভিন্ন বলে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন বর্ণ গঠনমূলক হয় — তাই বুদবুদে ঘূর্ণায়মান রঙের বিন্যাস দেখা যায়। বুদবুদ ফাটার ঠিক আগে সবচেয়ে পাতলা অংশ কালো দেখায় — কারণ t → 0 হলে দশা পরিবর্তনের কারণে সব বর্ণই ধ্বংসাত্মক হয়। তেলের স্তর পানিতে ছড়ালেও পুরুত্বের ভিন্নতায় একই রঙের খেলা দেখা যায়।

প্রশ্ন 10: CD-ডিস্কের পৃষ্ঠে রঙের ঝিলিক দেখা যায় কেন?

উত্তর: CD-র পৃষ্ঠে অত্যন্ত ঘন সারিতে আঁকা সর্পিল খাঁজ থাকে (ট্র্যাক ব্যবধান প্রায় 1.6 μm) — এটি একটি প্রতিফলক অপবর্তন গ্রেটিং হিসেবে কাজ করে। সাদা আলো পড়লে প্রতিটি বর্ণ গ্রেটিং সমীকরণ d·sinθ = nλ অনুযায়ী ভিন্ন কোণে অপবর্তিত হয় — ফলে দেখার কোণ বদলালেই ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ চোখে এসে পৌঁছায়, রঙধনুর মতো ঝিলিক ঘোরে। এটি প্রতিসরণের বিক্ষেপণ নয় — অপবর্তনের বর্ণ-বিচ্ছুরণ; প্রজাপতির ডানা ও ময়ূরের পালকের কিছু রঙও একই কাঠামোগত (structural) রঙের উদাহরণ, সেখানে রঞ্জক পদার্থ ছাড়াই গঠন থেকেই রঙ আসে। DVD-তে খাঁজ আরও ঘন (0.74 μm) বলে ঝিলিকের ধরনও কিছুটা আলাদা হয়।

প্রশ্ন 11: আকাশ নীল দেখায় কেন? চাঁদের আকাশ কালো কেন?

উত্তর: সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলের অণু ও ক্ষুদ্র কণায় বিক্ষিপ্ত (scatter) হয় — র‍্যালের সূত্র অনুযায়ী বিক্ষেপণের তীব্রতা ∝ 1/λ⁴, ফলে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল আলো লালের তুলনায় প্রায় 5 গুণ বেশি বিক্ষিপ্ত হয়ে সব দিক থেকে চোখে এসে পৌঁছায় — আকাশ নীল দেখায়। (বেগুনি আরও বেশি বিক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু সূর্যালোকে বেগুনি কম ও চোখ নীলের প্রতি বেশি সংবেদী।) চাঁদে বায়ুমণ্ডলই নেই — বিক্ষেপণ ঘটে না, তাই দিনের বেলায়ও আকাশ কালো, নক্ষত্র দেখা যায়; সূর্য সরাসরি সাদা-হলুদ দেখায়। একই কারণে মহাকাশ স্টেশন থেকেও আকাশ কালো দেখায়। সূর্যাস্তে লাল আকাশও এই সূত্রেরই অন্য পিঠ — দীর্ঘ পথে নীল বিক্ষিপ্ত হয়ে সরে গিয়ে লালটাই অবশিষ্ট থাকে।

প্রশ্ন 12: বিপদ সংকেত ও ট্রাফিক সিগন্যালে লাল আলো ব্যবহার করা হয় কেন?

উত্তর: লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান বর্ণালিতে সবচেয়ে বড় — র‍্যালে বিক্ষেপণ ∝ 1/λ⁴ সূত্রে লাল সবচেয়ে কম বিক্ষিপ্ত হয়। কুয়াশা, ধুলো ও ধোঁয়ার মধ্যদিয়ে যাওয়ার সময় অন্য বর্ণ ছড়িয়ে দুর্বল হয়ে গেলেও লাল আলো প্রায় সোজা পথে দূর পর্যন্ত পৌঁছায় — ফলে সিগন্যাল অনেক দূর থেকে ও খারাপ আবহাওয়ায়ও স্পষ্ট দেখা যায়। বিপদ সংকেতের উদ্দেশ্যই হলো সর্বাধিক দূরত্বে নজর কাড়া — তাই লালই যুক্তিযুক্ত পছন্দ। সঙ্গে সাংস্কৃতিক অভ্যস্ততাও জুড়েছে — রক্ত ও আগুনের রঙ হওয়ায় লাল সতর্কতার সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত। বিমানবন্দর ও রেললাইনেও একই কারণে লাল সংকেত প্রমিত। মনে রাখো, এটি লালের “শক্তি”র জন্য নয় — লাল ফোটনের শক্তি বরং সবচেয়ে কম; কারণটি পুরোপুরি বিক্ষেপণের।

প্রশ্ন 13: ব্যতিচারে শক্তির সংরক্ষণ লঙ্ঘিত হয় না কেন?

উত্তর: আপাত সন্দেহ ওঠে — দুটি সমান তীব্রতার (I₀) তরঙ্গ মিললে উজ্জ্বল জায়গায় 4I₀ আর অন্ধকারে 0 পাওয়া যায়, গড় 2I₀-ই আসে। আসলে ব্যতিচার শক্তি তৈরি বা ধ্বংস করে না — সে শক্তির পুনর্বণ্টন করে: ধ্বংসাত্মক অঞ্চল থেকে সরিয়ে গঠনমূলক অঞ্চলে জমা করে। উজ্জ্বল পটির তীব্রতা দুটি তরঙ্গের যোগফলের চেয়ে বেশি হওয়ার কারণ বিস্তারের যোগ হয় (A + A = 2A) এবং তীব্রতা বিস্তারের বর্গের সমানুপাতিক ((2A)² = 4A²); অন্ধকারে বিস্তার কেটে শূন্য। পুরো পর্দা জুড়ে হিসাব করলে মোট শক্তি দুটি উৎসের মোট শক্তির সমানই থাকে। অর্থাৎ সংরক্ষণ সূত্র অক্ষুণ্ণ — ব্যতিচার শুধু “কোথায় শক্তি পড়বে” তা সাজিয়ে দেয়, পরিমাণ বদলায় না।

প্রশ্ন 14: সমবর্তন (polarization) আলোর অনুপ্রস্থ তরঙ্গ হওয়ার প্রমাণ দেয় কেন?

উত্তর: অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের কম্পন সঞ্চালনের দিকেই হয় বলে তার কোনো “পাশের দিক” বাছাই করার সুযোগ থাকে না — সঞ্চালন অক্ষের সাপেক্ষে সে পূর্ণ প্রতিসম। ফলে শব্দের মতো অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গকে সমবর্তিত করা যায় না। আলোকে কিন্তু পোলারয়েড দিয়ে নির্দিষ্ট কম্পন-তলে সীমিত করা যায়, আর দুটি পোলারয়েড পরস্পরের লম্ব করে রাখলে আলো পুরোপুরি আটকে যায় — এটি সম্ভব কেবল যদি কম্পন সঞ্চালনের লম্ব তলে ঘটে, অর্থাৎ তরঙ্গ অনুপ্রস্থ হয়। এই পরীক্ষাটিই তরঙ্গ মতবাদে আলোর অনুপ্রস্থ স্বভাবের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। আলোতে কম্পমান হলো তড়িৎ ক্ষেত্র ভেক্টর — সমবর্তনের দিক বলতে সেই ভেক্টরের কম্পন-তলকেই বোঝায়। যান্ত্রিক উপমা: দড়ির তরঙ্গকে সরু ফাঁক দিয়ে পাঠানো — ফাঁকের দিকের কম্পনই শুধু পার পায়।

প্রশ্ন 15: অপোলারায়িত আলো পোলারয়েড দিয়ে পাঠালে তীব্রতা অর্ধেক হয়ে যায় কেন?

উত্তর: অপোলারায়িত আলোতে তড়িৎ ক্ষেত্র ভেক্টর সঞ্চালনের লম্ব সব দিকেই সমানভাবে এলোমেলোভাবে কম্পিত হয়। পোলারয়েড শুধু নিজের সঞ্চালন অক্ষের সমান্তরাল উপাংশটিকেই পার হতে দেয়। একটি এলোমেলো দিকে θ কোণে থাকা কম্পনের পার হওয়া উপাংশের তীব্রতা I₀cos²θ (মালুসের সূত্র) — সব দিকের গড় নিলে ⟨cos²θ⟩ = 1/2, অর্থাৎ মোট তীব্রতার ঠিক অর্ধেক পার হয়, বাকি অর্ধেক শোষিত হয়ে তাপে পরিণত হয়। এরপর আলোটি পূর্ণ সমবর্তিত হয়ে যায় — দ্বিতীয় পোলারয়েড (অ্যানালাইজার) ঘোরালে তীব্রতা cos²θ সূত্রে বদলায় এবং লম্ব অবস্থানে শূন্য হয়। সানগ্লাসে পোলারয়েড থাকলে এই কারণেই অনুভূমিক পৃষ্ঠের ঝলকানি (যা আংশিক সমবর্তিত) অনেকটা কেটে যায়।

প্রশ্ন 16: ব্রুস্টার কোণে আপতিত হলে প্রতিফলিত আলো পূর্ণ সমবর্তিত হয় কেন?

উত্তর: নির্দিষ্ট আপতন কোণে (ব্রুস্টার কোণ, tan i_B = μ) প্রতিফলিত ও প্রতিসরিত রশ্মি পরস্পরের লম্ব হয়। আলোর তড়িৎ ভেক্টরের যে উপাংশটি প্রতিসরিত রশ্মির দিকে কম্পিত হয়, সেটি প্রতিফলিত দিকে শক্তি বিকিরণ করতে পারে না — দ্বিমেরু (dipole) তার নিজের অক্ষ বরাবর বিকিরণ করে না। ফলে প্রতিফলিত আলোতে শুধু আপতন তলের লম্ব উপাংশটিই অবশিষ্ট থাকে — প্রতিফলিত রশ্মি পূর্ণ সমবর্তিত হয়। ব্যবহারিক প্রয়োগ: পোলারয়েড সানগ্লাস এই নীতিতেই পানি/রাস্তা থেকে প্রতিফলিত ঝলক কাটে; ফটোগ্রাফার পানির পৃষ্ঠের প্রতিফলন কমিয়ে ভেতরটা তুলতে ব্রুস্টার ব্যবস্থা কাজে লাগান। কাচের ক্ষেত্রে i_B ≈ 57° — এ কারণে জানালায় নির্দিষ্ট কোণে তাকালে প্রতিফলন বিশেষ আচরণ দেখায়।

প্রশ্ন 17: অপবর্তন গ্রেটিংয়ে রেখা বেশি ঘন হলে বর্ণালি তীক্ষ্ণ হয় কেন?

উত্তর: গ্রেটিংয়ে হাজার হাজার সমদূরবর্তী চিড় থেকে আসা তরঙ্গ ব্যতিচার করে। প্রতিটি ক্রমের চরমের তীক্ষ্ণতা নির্ভর করে কতগুলো চিড় অংশ নিচ্ছে তার ওপর — রেখা সংখ্যা N যত বেশি, একটি বর্ণের চরম তত সরু ও উজ্জ্বল হয়, কারণ সামান্য কোণ বদলালেই অসংখ্য তরঙ্গের দশা-বিন্যাস ভেঙে গঠনমূলক অবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। আবার রেখা ঘন মানে গ্রেটিং ধ্রুবক d ছোট — বিচ্ছুরণ (কৌণিক ছড়ানো) বেড়ে বর্ণগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে। দুটো মিলে বিচ্ছেদন ক্ষমতা (R = nN) বাড়ে — কাছাকাছি দুটি বর্ণালি রেখা আলাদা করা যায়। এই কারণেই বর্ণালি বিশ্লেষণে প্রিজমের বদলে গ্রেটিংই প্রমিত যন্ত্র — প্রিজমে কাছাকাছি রেখা মিশে যায়। আধুনিক স্পেকট্রোমিটারে প্রতি মিলিমিটারে 600–1200 রেখার গ্রেটিং সাধারণ।

প্রশ্ন 18: রেলির বিচ্ছেদন সীমা বলতে কী বোঝ? টেলিস্কোপের বিচ্ছেদন ক্ষমতা কীসের ওপর নির্ভর করে?

উত্তর: প্রতিটি আলোক যন্ত্রে বিন্দু-বস্তুর প্রতিবিম্ব অপবর্তনের কারণে একটি ছোট পটি-বলয়সহ ডিস্ক (Airy disc) আকারে পড়ে — দুটি কাছাকাছি বস্তুর ডিস্ক বেশি মিশে গেলে তাদের আলাদা বোঝা যায় না। রেলির মাপকাঠি: একটির কেন্দ্রীয় চরম অন্যটির প্রথম অবমের ওপর পড়লে বস্তুদ্বয়কে সদ্য বিচ্ছিন্ন (just resolved) ধরা হয় — সর্বনিম্ন কৌণিক ব্যবধান θ_min = 1.22λ/D। এখান থেকেই সিদ্ধান্ত: বিচ্ছেদন বাড়াতে D (অভিলক্ষ্যের ব্যাস) বড় ও λ ছোট হতে হয়। টেলিস্কোপের বড় আয়নার মূল উদ্দেশ্য শুধু বেশি আলো ধরা নয় — বিচ্ছেদনও; চোখের তারারন্ধ্র ছোট বলে চোখের বিচ্ছেদন সীমিত (প্রায় 1 আর্কমিনিট) — দুটি তারা এর চেয়ে কাছাকাছি হলে একটি বলেই মনে হয়।

প্রশ্ন 19: লেজার আলো সাধারণ আলোর চেয়ে বেশি সুসংগত কেন?

উত্তর: সাধারণ উৎসে (বাল্ব, সূর্য) প্রতিটি পরমাণু স্বতন্ত্রভাবে, যেকোনো মুহূর্তে এলোমেলো দশায় ফোটন ছাড়ে — সুসংগতির দৈর্ঘ্য মাত্র কয়েক মাইক্রোমিটার। লেজারে উদ্দীপিত নিঃসরণ (stimulated emission) ঘটে: একটি ফোটন উত্তেজিত পরমাণুকে ঠিক একই কম্পাঙ্ক, একই দশা ও একই দিকের যমজ ফোটন ছাড়তে বাধ্য করে — এই শৃঙ্খলায় কোটি কোটি ফোটন একই তরঙ্গের অংশ হয়ে চলে। ফলে লেজারের সুসংগতি দৈর্ঘ্য মিটার থেকে কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে, আর কম্পাঙ্ক-বিস্তার অত্যন্ত সরু (প্রায় একরঙা)। এই কারণেই দীর্ঘ পথ পার্থক্যের ব্যতিচার (হলোগ্রাফি, দৈর্ঘ্য মাপার ইন্টারফেরোমিটার) শুধু লেজার দিয়েই সম্ভব। সুসংগতি ছাড়াও লেজারের দিক-নির্দিষ্টতা ও তীব্রতা আলাদা বৈশিষ্ট্য — কিন্তু অনুধাবনমূলে সুসংগতিই প্রধান পয়েন্ট।

প্রশ্ন 20: তরঙ্গমুখ বলতে কী বোঝ? দূরের নক্ষত্রের আলোর তরঙ্গমুখ সমতল ধরা হয় কেন?

উত্তর: কোনো তরঙ্গের সমদশায় কম্পমান বিন্দুগুলোকে যোগ করলে যে তল পাওয়া যায়, তাই তরঙ্গমুখ — তরঙ্গ সবসময় তরঙ্গমুখের লম্ব দিকে অগ্রসর হয় (এই লম্ব রেখাগুলোই রশ্মি)। বিন্দু উৎস থেকে গোলীয় তরঙ্গমুখ বের হয়; উৎস অসীম দূরে গেলে গোলকের ব্যাসার্ধ অসীমের কাছাকাছি হয় — যেকোনো সীমিত পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে বক্রতা এত কম যে তরঙ্গমুখকে সমতল ধরা যায়। নক্ষত্র কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে থাকায় পৃথিবীতে পৌঁছানো আলোর তরঙ্গমুখ কার্যত সমতল — এই আসন্নীকরণ দিয়েই টেলিস্কোপের ফোকাস ও ইন্টারফেরোমিটারের হিসাব সহজ হয়। বিপরীতভাবে কাছের ছোট উৎসে গোলীয় তরঙ্গমুখ ধরতে হয় — লেন্সের সূত্রে এই পার্থক্যই বস্তু-দূরত্বের হিসাব নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রশ্ন 21: হলোগ্রাফি বলতে কী বোঝ? সাধারণ ছবির সঙ্গে এর পার্থক্য কী?

উত্তর: হলোগ্রাফি হলো লেজার আলো দিয়ে বস্তুর ত্রিমাত্রিক তথ্য রেকর্ড করার পদ্ধতি। বস্তু থেকে প্রতিফলিত লেজার রশ্মি ও একটি সরাসরি প্রসঙ্গ (reference) রশ্মি ফিল্মে মিলে ব্যতিচার বিন্যাস তৈরি করে — এই হলোগ্রামে সংরক্ষিত থাকে শুধু তীব্রতা নয়, তরঙ্গের দশা তথ্যও। পরে একই লেজার আলো হলোগ্রামে ফেললে অপবর্তনে মূল তরঙ্গমুখ পুনর্গঠিত হয় — ফলে ভাসমান ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্ব দেখা যায়, যাকে বিভিন্ন কোণ থেকে দেখা যায় সত্যিকারের বস্তুর মতোই। সাধারণ ছবিতে শুধু তীব্রতা ও বর্ণ ধরা থাকে, দশা হারিয়ে যায় — তাই ছবি দ্বিমাত্রিক। ব্যাংক নোট ও কার্ডের নিরাপত্তা হলোগ্রাম এই প্রযুক্তিরই হালকা রূপ। এইচএসসি পর্যায়ে মনে রাখার কথা: হলোগ্রাফি = ব্যতিচারে রেকর্ড + অপবর্তনে পুনরুদ্ধার।

প্রশ্ন 22: দ্বি-চিড় পরীক্ষার একটি চিড় ঢেকে দিলে ব্যতিচার পটি হারিয়ে যায় কেন?

উত্তর: ব্যতিচারের জন্য দুটি সুসংগত তরঙ্গের উপরিপাতন অপরিহার্য। একটি চিড় ঢেকে দিলে পর্দায় পৌঁছায় শুধু একটি চিড়ের তরঙ্গ — উপরিপাতনের দ্বিতীয় পক্ষই থাকে না, ফলে গঠনমূলক-ধ্বংসাত্মক বিন্যাস তৈরি হওয়ার প্রশ্নই থাকে না। বরং তখন দেখা যায় একক চিড়ের অপবর্তন বিন্যাস — মাঝখানে প্রশস্ত উজ্জ্বল অংশ, পাশে দ্রুত ম্লান প্রান্ত, কিন্তু সুষম ব্যবধানের তীক্ষ্ণ পটি নয়। এই পরীক্ষাটি প্রমাণ করে পটি দুটি চিড়ের যৌথ ফল — কোনো একটির একক সম্পত্তি নয়। মজার বিষয়: দুটি চিড় খোলা থাকলেও সামগ্রিক উজ্জ্বল আবরণটি একক-চিড় অপবর্তন দিয়েই নির্ধারিত হয়; ব্যতিচার পটিগুলো সেই আবরণের ভেতরে বসে — তাই কোনো পটি “নিখোঁজ” হলে অপবর্তন-অবমের সঙ্গে তার মিল থাকলেই বোঝা যায়।


ভৌত আলোকবিজ্ঞানের মূল বার্তা: আলো তরঙ্গ — তার প্রমাণ তিনটি: ব্যতিচার, অপবর্তন ও সমবর্তন। পরের পোস্টে আসছে অষ্টম অধ্যায় — আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স-এর অনুধাবনমূলক ম্যারাথন।

এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের সপ্তম অধ্যায় ভৌত আলোকবিজ্ঞান-এর সব গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর এক পোস্টে — ব্যতিচার, অপবর্তন, সমবর্তন ও হাইগেনসের নীতি সহ মোট ২২টি প্রশ্ন।
Picture of Rashed Rion
Rashed Rion

Physics, University of Chittagong

Facebook
Scroll to Top