পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের অষ্টম অধ্যায় — আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স। কোনো বস্তু আলোর বেগে চলতে পারে না কেন, ধাতব পৃষ্ঠে আলো পড়লেই ইলেকট্রন বেরিয়ে আসে কেন, আদর্শ কালো বস্তুই বা সেরা বিকিরক কেন — এই অধ্যায়ের অনুধাবনমূলক প্রশ্নগুলো আপেক্ষিকতা, আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া, এক্স-রশ্মি, কম্পটন ক্রিয়া, দ্য ব্রগলি তরঙ্গ, কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ ও মৌলিক বল ঘিরে। এই পোস্টে অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর একসাথে সাজানো হয়েছে — বোর্ড পরীক্ষা ও টেস্ট পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে। প্রতিটি উত্তর ২ নম্বরের উপযোগী করে সংক্ষিপ্ত ও ধারণা-নির্ভর করে লেখা।
অনুধাবনমূলক প্রশ্নের তালিকা
- প্রশ্ন 01: আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার দুটি স্বীকার্য কী? আলোর বেগ সব পর্যবেক্ষকের কাছে সমান হয় কেন?
- প্রশ্ন 02: দৈর্ঘ্য সংকোচন বলতে কী বোঝ? চলন্ত বস্তু কি সত্যিই খাটো হয়ে যায়?
- প্রশ্ন 03: সময় প্রসারণ বলতে কী বোঝ? মিউঅন কণা পৃথিবীতে পৌঁছানো এর প্রমাণ কেন?
- প্রশ্ন 04: ভর-শক্তি সমতুল্যতা E = mc² বলতে কী বোঝ? সূর্যের শক্তির উৎসের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
- প্রশ্ন 05: আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া আলোর কণা-স্বভাবের প্রমাণ কেন?
- প্রশ্ন 06: তীব্রতা বাড়ালেই ইলেকট্রন নির্গত হয় না, কিন্তু কম্পাঙ্ক বাড়ালে হয় কেন?
- প্রশ্ন 07: কম্পটন ক্রিয়ায় বিক্ষিপ্ত X-রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় কেন?
- প্রশ্ন 08: দ্য ব্রগলির বস্তু-তরঙ্গ বলতে কী বোঝ? ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে এটি কীভাবে কাজে লাগে?
- প্রশ্ন 09: X-রশ্মি কীভাবে উৎপন্ন হয়? ক্যাথোড রশ্মির সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
- প্রশ্ন 10: গ্যালিলিও রূপান্তর লরেঞ্জ রূপান্তরের একটি বিশেষ অবস্থা — ব্যাখ্যা কর।
- প্রশ্ন 11: কোনো গতিশীল বস্তুর দৈর্ঘ্য কি কখনো শূন্য হতে পারে? ব্যাখ্যা কর।
- প্রশ্ন 12: কম্পটন ক্রিয়া কী?
- প্রশ্ন 13: এক্স রশ্মি উৎপাদন এবং আলোক তড়িৎ ক্রিয়ার সাহায্যে ইলেকট্রন উৎপাদন পরস্পর বিপরীত ক্রিয়া — ব্যাখ্যা কর।
- প্রশ্ন 14: চিরায়ত বলবিদ্যার সাহায্যে আলোক তড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করা সম্ভব কি-না ব্যাখ্যা কর।
- প্রশ্ন 15: আদর্শ কালো বস্তু উত্তম শোষক ও উত্তম বিকিরক — ব্যাখ্যা কর।
- প্রশ্ন 16: সবল নিউক্লীয় বল ও দুর্বল নিউক্লীয় বলের মধ্যে পার্থক্য লেখ।
- প্রশ্ন 17: জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য সুবিধাজনক কেন?
- প্রশ্ন 18: কোনো বস্তুকে আলোর বেগে ছোড়া সম্ভব নয় কেন?
- প্রশ্ন 19: কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ ব্যাখ্যায় প্লাংকের কোয়ান্টাম ধারণার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?
- প্রশ্ন 20: GPS সিস্টেমে আপেক্ষিকতার সংশোধন না করলে অবস্থান ভুল হয় কেন?
- প্রশ্ন 21: ফোটনের ভরবেগ আছে — বিকিরণ চাপ বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 22: কণা পদার্থবিজ্ঞানে শক্তির একক হিসেবে ইলেকট্রন-ভোল্ট (eV) সুবিধাজনক কেন?
প্রশ্ন 01: আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার দুটি স্বীকার্য কী? আলোর বেগ সব পর্যবেক্ষকের কাছে সমান হয় কেন?
উত্তর: দুটি স্বীকার্য: (1) পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে একই রূপে প্রযোজ্য — কোনো কাঠামোই বিশেষ মর্যাদা পায় না; (2) শূন্যে আলোর বেগ (c ≈ 3 × 10⁸ m/s) উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতি নির্বিশেষে সব জড় কাঠামোতে সমান। দ্বিতীয় স্বীকার্যটি মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার ফল — পৃথিবীর গতি যেদিকেই হোক, আলোর বেগে কোনো পার্থক্য ধরা পড়েনি, অর্থাৎ “ইথার” নামের মাধ্যমের অস্তিত্ব নেই যার সাপেক্ষে বেগ মাপা যাবে। আলোর বেগ ধ্রুব রাখতে গিয়েই স্থান ও কালকে নমনীয় হতে হয় — দৈর্ঘ্য সংকোচন ও সময় প্রসারণ সেই সমন্বয়েরই ফল। চিরায়ত বেগ-যোগ সূত্র (u + v) আলোর ক্ষেত্রে খাটে না; আপেক্ষিক বেগ-যোগে ফল কখনোই c ছাড়ায় না। এই দুটি স্বীকার্য থেকে পুরো বিশেষ আপেক্ষিকতা গাণিতিকভাবে বেরিয়ে আসে — এটাই এর সৌন্দর্য।
প্রশ্ন 02: দৈর্ঘ্য সংকোচন বলতে কী বোঝ? চলন্ত বস্তু কি সত্যিই খাটো হয়ে যায়?
উত্তর: কোনো বস্তু পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে v বেগে চললে গতির দিকে তার পরিমাপকৃত দৈর্ঘ্য L = L₀√(1 − v²/c²) হয় — স্থির কাঠামোর দৈর্ঘ্য L₀-এর চেয়ে কম। এটি কোনো যান্ত্রিক চাপে সঙ্কুচিত হওয়া নয় — বস্তুটির নিজের কাঠামোতে (যেখানে সে স্থির) তার দৈর্ঘ্য পুরোপুরি L₀-ই থাকে; সংকোচন ঘটে অন্য কাঠামো থেকে “পরিমাপ” করার পদ্ধতিতে, কারণ আপেক্ষিকতায় যুগপত্তা (simultaneity) পরম নয় — দুই প্রান্তের অবস্থান একই মুহূর্তে ধরা বিভিন্ন কাঠামোতে বিভিন্ন ঘটনা নির্দেশ করে। সংকোচন শুধু গতির দিকেই হয়, লম্ব দিকে নয়। দৈনন্দিন বেগে v²/c² এত ক্ষুদ্র যে প্রভাব শূন্যের কাছাকাছি — উল্লেখযোগ্য হতে হলে বেগ c-এর উল্লেখযোগ্য ভগ্নাংশ হতে হয়। পারস্পরিকতাও আছে: চলন্ত কাঠামোর পর্যবেক্ষকও স্থির কাঠামোর রডকে সংকুচিত মাপবে — দুজনেই নিজ নিজ পরিমাপে সঠিক।
প্রশ্ন 03: সময় প্রসারণ বলতে কী বোঝ? মিউঅন কণা পৃথিবীতে পৌঁছানো এর প্রমাণ কেন?
উত্তর: চলন্ত ঘড়ি স্থির ঘড়ির তুলনায় ধীরে চলে: Δt = Δt₀/√(1 − v²/c²) — চলন্ত কাঠামোতে অতিবাহিত সময় বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে বেশি মনে হয়। প্রমাণ — মিউঅন: বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বস্তরে সৃষ্ট মিউঅনের নিজস্ব আয়ুষ্কাল মাত্র 2.2 μs; আলোর কাছাকাছি বেগেও এই সময়ে সে প্রায় 660 m-এর বেশি যাওয়ার কথা নয়, অথচ ভূপৃষ্ঠে প্রচুর মিউঅন ধরা পড়ে, যাদের 10–15 km পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ব্যাখ্যা: পৃথিবীর কাঠামোতে মিউঅনের ঘড়ি ধীর চলে — তার কার্যকর আয়ু γ গুণ বেড়ে যায়; আর মিউঅনের নিজের কাঠামোতে বায়ুমণ্ডলের পুরুত্ব দৈর্ঘ্য-সংকোচনে কমে যায় — দুটি বর্ণনাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কণা ত্বরণযন্ত্রে প্রতিদিন এই প্রভাব মেপে যাচাই করা হয়; এটি কেবল তত্ত্বের পাতায় নেই।
প্রশ্ন 04: ভর-শক্তি সমতুল্যতা E = mc² বলতে কী বোঝ? সূর্যের শক্তির উৎসের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
উত্তর: ভর ও শক্তি একই জিনিসের দুটি রূপ — ভরকে শক্তিতে ও শক্তিকে ভরে রূপান্তর করা যায়, রূপান্তর হার E = mc²। c² বিশাল (9 × 10¹⁶) বলে সামান্য ভরও বিশাল শক্তির সমতুল্য: 1 g ভর পুরোপুরি শক্তি হলে প্রায় 9 × 10¹³ J পাওয়া যেত। সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 6 × 10¹¹ kg হাইড্রোজেন ফিউশনে হিলিয়ামে পরিণত হয়; উৎপাদের ভর বিক্রিয়কগুলোর চেয়ে প্রায় 0.7% কম — এই হারানো ভরই শক্তি হয়ে বেরিয়ে আসে, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 4 × 10⁹ kg ভর শক্তিতে রূপ নেয়। অর্থাৎ সূর্য আসলে ভর খরচ করে জ্বলছে। পারমাণবিক বিক্রিয়া ছাড়া দৈনন্দিন রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও ভর-পরিবর্তন ঘটে, তবে তা এতই নগণ্য (10⁻¹⁰ ভগ্নাংশ) যে মাপা যায় না — তাই রসায়নে ভর সংরক্ষণ কার্যত সত্য মনে হয়।
প্রশ্ন 05: আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া আলোর কণা-স্বভাবের প্রমাণ কেন?
উত্তর: ধাতব পৃষ্ঠে আলো ফেললে ইলেকট্রন নির্গত হওয়ার এই ঘটনায় তরঙ্গ মতবাদ তিনটি পর্যবেক্ষণ ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ: (1) নির্দিষ্ট সীমা কম্পাঙ্কের (ν₀) নিচের আলো যত তীব্রই হোক, কোনো ইলেকট্রন বেরোয় না; তরঙ্গ মতে তীব্র আলোর শক্তি জমে ইলেকট্রন বের হওয়ার কথা। (2) নির্গমন তাৎক্ষণিক — দুর্বল আলোতেও দেরি হয় না; তরঙ্গে শক্তি ছড়িয়ে থাকায় জমতে সময় লাগত। (3) নির্গত ইলেকট্রনের সর্বোচ্চ গতিশক্তি তীব্রতার ওপর নয়, কম্পাঙ্কের ওপর নির্ভর করে। আইনস্টাইনের ফোটন ধারণা তিনটিই ব্যাখ্যা করে: আলো আসে E = hν শক্তির প্যাকেটে; একটি ফোটন একটি ইলেকট্রনকে পুরো শক্তি একবারে দেয় — hν > কার্য অপেক্ষক (φ) হলেই নির্গমন, বাড়তি অংশ গতিশক্তি। তীব্রতা শুধু ফোটনের সংখ্যা (তাই নির্গত ইলেকট্রনের সংখ্যা) বাড়ায়।
প্রশ্ন 06: তীব্রতা বাড়ালেই ইলেকট্রন নির্গত হয় না, কিন্তু কম্পাঙ্ক বাড়ালে হয় কেন?
উত্তর: কারণ ইলেকট্রন একবারে একটি মাত্র ফোটনের শক্তি গ্রহণ করে — ফোটনের মোট সংখ্যা (তীব্রতা) তার পাওয়া শক্তির পরিমাণ বদলায় না। প্রতিটি ফোটনের শক্তি E = hν শুধু কম্পাঙ্কের ওপর নির্ভরশীল। কম্পাঙ্ক সীমা মানের নিচে থাকলে প্রতিটি ফোটনই কার্য অপেক্ষক φ-এর চেয়ে দুর্বল — কোটি কোটি এমন ফোটন এলেও কোনো একক ইলেকট্রন বের হওয়ার মতো শক্তি পায় না (ইলেকট্রন একাধিক ফোটনের শক্তি মজুত করে রাখতে পারে না)। কম্পাঙ্ক বাড়িয়ে hν > φ করলেই একটি ফোটনই যথেষ্ট — নির্গমন শুরু হয়, এবং বাড়তি শক্তি (hν − φ) গতিশক্তি হিসেবে আসে। ব্যবহারিক দিক: এ কারণে UV আলোতে কাজ করা ফটোসেল লাল আলোর প্রখর রশ্মিতেও সাড়া দেয় না — সৌর প্যানেলের দক্ষতার সীমাও এই একই পদার্থবিজ্ঞান নির্ধারণ করে।
প্রশ্ন 07: কম্পটন ক্রিয়ায় বিক্ষিপ্ত X-রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় কেন?
উত্তর: কম্পটন X-রশ্মির ফোটনকে কণা হিসেবে ধরে স্থির ইলেকট্রনের সঙ্গে তার স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ বিবেচনা করেন। সংঘর্ষে ফোটন তার শক্তির একটি অংশ ইলেকট্রনকে গতিশক্তি হিসেবে দিয়ে দেয় — শক্তি হারানোয় ফোটনের কম্পাঙ্ক কমে, ফলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়ে: Δλ = (h/m₀c)(1 − cosθ)। এই বৃদ্ধি শুধু বিক্ষেপণ কোণ θ-এর ওপর নির্ভর করে, আপতিত তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা লক্ষ্যবস্তুর উপাদানের ওপর নয় — পরীক্ষায় ঠিক তাই পাওয়া গেছে। তরঙ্গ মতবাদে বিক্ষিপ্ত বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য একই থাকার কথা ছিল — পার্থক্যটাই ফোটনের বাস্তব কণা-চরিত্রের (শক্তি ও ভরবেগবিশিষ্ট) সরাসরি প্রমাণ। সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পশ্চাৎ বিক্ষেপণে (θ = 180°) হয়, যেখানে ইলেকট্রন সর্বাধিক শক্তি পায়।
প্রশ্ন 08: দ্য ব্রগলির বস্তু-তরঙ্গ বলতে কী বোঝ? ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে এটি কীভাবে কাজে লাগে?
উত্তর: দ্য ব্রগলি প্রস্তাব করেন: আলোর মতো বস্তুকণারও দ্বৈত স্বভাব আছে — v বেগে চলন্ত m ভরের কণার সঙ্গে যুক্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্য λ = h/mv। দ্রুতগামী ইলেকট্রনের λ দৃশ্যমান আলোর চেয়ে হাজার গুণ ছোট হতে পারে। বিচ্ছেদন সীমা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক (θ_min ∝ λ) — তাই ইলেকট্রন রশ্মি দিয়ে গঠিত প্রতিবিম্বে আলোর মাইক্রোস্কোপের চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম বিবরণ ধরা পড়ে; ডেভিসন-গার্মারের পরীক্ষায় ইলেকট্রনের অপবর্তন ধরা পড়ায় তরঙ্গ-স্বভাব প্রমাণিত হয়। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ত্বরিত ইলেকট্রনের λ প্রায় পিকোমিটার মাত্রার — বিবর্ধন দশ লক্ষ গুণ পর্যন্ত সম্ভব, ভাইরাস ও অণুর গঠন দেখা যায়। তবে নমুনার প্রস্তুতি জটিল ও নমুনা ভ্যাকুয়ামে রাখতে হয় — এগুলোই এর সীমাবদ্ধতা।
প্রশ্ন 09: X-রশ্মি কীভাবে উৎপন্ন হয়? ক্যাথোড রশ্মির সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
উত্তর: X-নলে ক্যাথোড থেকে নির্গত দ্রুতগামী ইলেকট্রন উচ্চ বিভব পার্থক্যে ত্বরিত হয়ে ভারী ধাতব লক্ষ্যবস্তুতে (টাংস্টেন) আঘাত করলে দুই প্রক্রিয়ায় X-রশ্মি উৎপন্ন হয়: (1) ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ মন্দিত হলে হারানো গতিশক্তি ফোটন আকারে বেরোয় — এটি অবিচ্ছিন্ন বর্ণালির ব্রেমস্ট্রালুং বিকিরণ; (2) ভেতরের কক্ষের ইলেকট্রন ছিটকে গেলে বাইরের কক্ষের ইলেকট্রন এসে শূন্যতা পূরণ করার সময় বৈশিষ্ট্যসূচক রেখা বর্ণালি নির্গত হয়। ক্যাথোড রশ্মি হলো স্বয়ং ইলেকট্রনের ধারা — ঋণাত্মক আধানযুক্ত, ভরবিশিষ্ট, তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রে বেঁকে যায়; X-রশ্মি তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ — আধানহীন, ভরহীন, ক্ষেত্রে বেঁকে না, ভেদন ক্ষমতা অনেক বেশি। অর্থাৎ ক্যাথোড রশ্মি “কারণ”, X-রশ্মি তার আঘাতের “ফল”।
প্রশ্ন 10: গ্যালিলিও রূপান্তর লরেঞ্জ রূপান্তরের একটি বিশেষ অবস্থা — ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: লরেঞ্জ রূপান্তর অনুযায়ী v বেগে চলমান কাঠামোতে x′ = γ(x − vt) এবং t′ = γ(t − vx/c²), যেখানে γ = 1/√(1 − v²/c²)। এখন কাঠামোটির বেগ আলোর বেগের তুলনায় নগণ্য হলে, অর্থাৎ v << c শর্তে, v²/c² প্রায় শূন্য ধরা যায় — তখন γ ≈ 1 হয় এবং vx/c² পদটিও উপেক্ষণীয় হয়ে পড়ে। ফলে সমীকরণ দুটি দাঁড়ায় x′ = x − vt এবং t′ = t — যা হুবহু গ্যালিলিও রূপান্তর, যেখানে সময় সব কাঠামোতে একই ও পরম ধরা হয়। অর্থাৎ গ্যালিলিও রূপান্তর আলাদা কোনো সূত্র নয়; তা লরেঞ্জ রূপান্তরেরই নিম্ন-বেগ সীমা। দৈনন্দিন বেগে দুটির ফল প্রায় একই বলে চিরায়ত বলবিদ্যা কাজ করে, কিন্তু বেগ c-এর কাছাকাছি গেলেই কেবল লরেঞ্জ রূপান্তরই সঠিক থাকে।
প্রশ্ন 11: কোনো গতিশীল বস্তুর দৈর্ঘ্য কি কখনো শূন্য হতে পারে? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: না, পারে না। দৈর্ঘ্য সংকোচনের সূত্র L = L₀√(1 − v²/c²) অনুযায়ী দৈর্ঘ্য শূন্য হতে হলে বস্তুটির বেগ ঠিক আলোর বেগের সমান (v = c) হতে হবে। কিন্তু ভরবিশিষ্ট কোনো বস্তুকে c বেগে পৌঁছাতে অসীম শক্তি প্রয়োজন, যা সরবরাহ করা অসম্ভব — তাই বস্তুটি কখনোই c বেগ অর্জন করতে পারে না। বেগ c-এর যত কাছাকাছি যায়, সংকুচিত দৈর্ঘ্য তত শূন্যের দিকে এগোয়, কিন্তু কখনোই শূন্য হয় না। আরেকটি দিক হলো, সংকোচন ঘটে শুধু গতির দিকে; গতির লম্ব দিকের দৈর্ঘ্য অপরিবর্তিত থাকে। আর বস্তুটির নিজস্ব কাঠামোতে তার দৈর্ঘ্য সবসময়ই স্থির দৈর্ঘ্য L₀-ই থাকে। সুতরাং গতিশীল বস্তুর পরিমাপকৃত দৈর্ঘ্য ক্ষুদ্র হতে পারে, শূন্য কখনো নয়।
প্রশ্ন 12: কম্পটন ক্রিয়া কী?
উত্তর: এক্স-রশ্মির ফোটন কোনো পদার্থের প্রায় মুক্ত ও শিথিলভাবে আবদ্ধ ইলেকট্রনের সঙ্গে সংঘর্ষে নিজের শক্তির একটি অংশ ইলেকট্রনটিকে দিয়ে বিক্ষিপ্ত হলে বিক্ষিপ্ত রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য আপতিত রশ্মির চেয়ে বেড়ে যায় — এই ঘটনাকে কম্পটন ক্রিয়া বলে। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি Δλ = (h/m₀c)(1 − cosθ), যা শুধু বিক্ষেপণ কোণের ওপর নির্ভর করে। এই ক্রিয়া ফোটনের কণা-স্বভাবের (শক্তি ও ভরবেগের) সরাসরি প্রমাণ।
প্রশ্ন 13: এক্স রশ্মি উৎপাদন এবং আলোক তড়িৎ ক্রিয়ার সাহায্যে ইলেকট্রন উৎপাদন পরস্পর বিপরীত ক্রিয়া — ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ায় ধাতব পৃষ্ঠে উপযুক্ত কম্পাঙ্কের ফোটন আপতিত হয় এবং ফোটনটি তার সম্পূর্ণ শক্তি (hν) একটি ইলেকট্রনকে দিয়ে দেয় — ইলেকট্রন কার্য অপেক্ষক অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে আসে, বাড়তি শক্তি পায় গতিশক্তি হিসেবে। অর্থাৎ এখানে বিকিরণ শক্তি রূপান্তরিত হয় ইলেকট্রনের শক্তিতে; প্রক্রিয়াটির দিক: ফোটন → ইলেকট্রন নির্গমন। বিপরীতে, এক্স-রশ্মি উৎপাদনে দ্রুতগামী ইলেকট্রন ভারী ধাতব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে হঠাৎ থেমে যায় কিংবা মন্দিত হয় — তার হারানো গতিশক্তিই ফোটন আকারে নির্গত হয়, যা এক্স-রশ্মি; এখানে দিক: ইলেকট্রনের গতিশক্তি → ফোটন। একটি প্রক্রিয়ায় ফোটন শোষিত হয়ে ইলেকট্রন মুক্ত হয়, অন্যটিতে ইলেকট্রনের শক্তি খরচ হয়ে ফোটন সৃষ্টি হয় — চিত্রটি ঠিক পরস্পরের উল্টো বলেই দুটিকে বিপরীত ক্রিয়া বলা হয়।
প্রশ্ন 14: চিরায়ত বলবিদ্যার সাহায্যে আলোক তড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করা সম্ভব কি-না ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: না, সম্ভব নয়। চিরায়ত তরঙ্গ মতবাদ অনুযায়ী আলোর শক্তি তার তীব্রতার ওপর নির্ভর করে এবং তরঙ্গ সম্মুখভাগ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে — তাহলে যেকোনো কম্পাঙ্কের যথেষ্ট তীব্র আলো কিছু সময় ধরে পড়লে ইলেকট্রনের শক্তি জমে নির্গমন ঘটার কথা, নির্গত ইলেকট্রনের গতিশক্তি তীব্রতা বাড়ালে বাড়ার কথা, এবং দুর্বল আলোতে নির্গমনে বিলম্ব হওয়ার কথা। পরীক্ষায় দেখা যায় ঠিক উল্টোটি: একটি সীমা কম্পাঙ্কের নিচে যত তীব্র আলোই হোক কোনো ইলেকট্রন বেরোয় না, নির্গমন ঘটে তাৎক্ষণিকভাবে, আর গতিশক্তি নির্ভর করে শুধু কম্পাঙ্কের ওপর, তীব্রতার ওপর নয়। এই তিনটি পর্যবেক্ষণের একটিও চিরায়ত বলবিদ্যা ব্যাখ্যা করতে পারে না — ব্যাখ্যা মেলে কেবল আইনস্টাইনের ফোটন ধারণায়, যেখানে প্রতিটি ফোটনের শক্তি E = hν।
প্রশ্ন 15: আদর্শ কালো বস্তু উত্তম শোষক ও উত্তম বিকিরক — ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: আদর্শ কালো বস্তু বা কৃষ্ণবস্তু তার ওপর আপতিত সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ সম্পূর্ণ শোষণ করে — কিছুই প্রতিফলিত বা ভেদ করে না; তাই এর শোষণ ক্ষমতা সর্বোচ্চ, a = 1, অর্থাৎ এটি সম্ভাব্য সেরা শোষক। অপরদিকে কির্চফের সূত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কোনো বস্তুর বিকিরণ ক্ষমতা ও শোষণ ক্ষমতার অনুপাত সব বস্তুর জন্য সমান — ভালো শোষক মানেই ভালো বিকিরক। যেহেতু কৃষ্ণবস্তুর শোষণ ক্ষমতা সর্বাধিক, একই তাপমাত্রায় এর বিকিরণ ক্ষমতাও সর্বাধিক হয় (নিঃসরণশীলতা e = 1); অন্য যেকোনো বাস্তব বস্তু ওই তাপমাত্রায় এর চেয়ে কম বিকিরণ করে। এ কারণেই কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ বর্ণালি একটি সার্বজনীন মানদণ্ড — তা নির্ভর করে শুধু তাপমাত্রার ওপর, বস্তুটির উপাদানের ওপর নয়।
প্রশ্ন 16: সবল নিউক্লীয় বল ও দুর্বল নিউক্লীয় বলের মধ্যে পার্থক্য লেখ।
উত্তর: দুটি বলের প্রধান পার্থক্যগুলো হলো: (১) তীব্রতা — সবল নিউক্লীয় বল প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী; দুর্বল নিউক্লীয় বল তার তুলনায় বহুগুণ দুর্বল। (২) পাল্লা — সবল বলের পাল্লা প্রায় 10⁻¹⁵ m, অর্থাৎ নিউক্লিয়াসের ব্যাসের মাত্রায়; দুর্বল বলের পাল্লা আরও অনেক ছোট, প্রায় 10⁻¹⁸ m। (৩) ভূমিকা — সবল বল প্রোটনগুলোর পারস্পরিক বিকর্ষণ সত্ত্বেও নিউক্লিয়নগুলোকে নিউক্লিয়াসে বেঁধে রাখে, অর্থাৎ নিউক্লিয়াসের স্থায়িত্বের কারণ এটি; দুর্বল বল কোনো বন্ধন তৈরি করে না, বরং বিটা ক্ষয়ের মতো নিউক্লিয়াসের রূপান্তর ঘটায় (নিউট্রন → প্রোটন + ইলেকট্রন + অ্যান্টিনিউট্রিনো)। (৪) ক্রিয়ার ধরন — সবল বল আধান-নিরপেক্ষভাবে প্রোটন-প্রোটন, নিউট্রন-নিউট্রন ও প্রোটন-নিউট্রন সব জোড়ার মধ্যেই কাজ করে; দুর্বল বল কণার “ফ্লেভার” বদলে দেয়।
প্রশ্ন 17: জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য সুবিধাজনক কেন?
উত্তর: প্রায় 35,786 km উচ্চতায় নিরক্ষীয় তলে ঘূর্ণায়মান স্যাটেলাইটের কক্ষপথ-পর্যায়কাল পৃথিবীর আহ্নিক গতির সমান (24 ঘণ্টা) এবং দিকও একই — ফলে স্যাটেলাইটটি ভূপৃষ্ঠের একটি বিন্দুর ওপরে আপেক্ষিকভাবে স্থির থাকে। সুবিধা: ভূপৃষ্ঠের অ্যান্টেনা একবার স্যাটেলাইটের দিকে তাক করলেই হয় — চলমান লক্ষ্য অনুসরণ (tracking) করা লাগে না; একটি স্যাটেলাইট পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে অবিরত কভারেজ দেয়, তিনটিতে প্রায় পুরো পৃথিবী (মেরু অঞ্চল ছাড়া)। টেলিভিশন সম্প্রচার ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে এটাই আদর্শ। মূল্য: দূরত্ব বেশি বলে সংকেত যেতে-আসতে প্রায় 0.25 s দেরি হয় — লাইভ কথোপকথনে হালকা প্রতিধ্বনি-ভাব টের পাওয়া যায়; মেরু অঞ্চল কভার পায় না, সেখানে নিম্ন-কক্ষপথের স্যাটেলাইট লাগে।
প্রশ্ন 18: কোনো বস্তুকে আলোর বেগে ছোড়া সম্ভব নয় কেন?
উত্তর: আপেক্ষিক ভর (শক্তি) m = m₀/√(1 − v²/c²) — বেগ বাড়লে হর ছোট হয়ে কার্যকর জড়তা বাড়তে থাকে; v → c হলে প্রয়োজনীয় শক্তি অসীমের দিকে যায়। অসীম শক্তি সরবরাহ করা অসম্ভব, তাই ভরবিশিষ্ট কোনো বস্তু কখনোই c-তে পৌঁছাতে পারে না — যত শক্তিই দেওয়া হোক, বেগ c-এর কাছাকাছি ঘুরঘুর করে, ছুঁতে পারে না। ত্বরণযন্ত্রে ইলেকট্রনকে 0.999999c পর্যন্ত ত্বরিত করা গেলেও c হয় না — বরং দেওয়া শক্তি গতিশক্তিতে জমা হয়। শুধু ভরহীন কণা (ফোটন) সবসময় ঠিক c বেগে চলে — তাদের জন্য মাঝামাঝি কোনো বেগ নেই। এই সীমাটি কারিগরি অক্ষমতা নয়, প্রকৃতির সূত্র — সঙ্গে কার্য-কারণের ক্রম রক্ষা পায়: তথ্য c-এর বেশি বেগে গেলে কোনো কাঠামোতে ফল কারণের আগে ঘটত।
প্রশ্ন 19: কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ ব্যাখ্যায় প্লাংকের কোয়ান্টাম ধারণার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?
উত্তর: চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী উত্তপ্ত বস্তুর বিকিরণ বর্ণালিতে উচ্চ কম্পাঙ্কের দিকে শক্তি সীমাহীন বাড়ার কথা — যা পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মেলে না এবং “অতিবেগুনি বিপর্যয়” নামে পরিচিত। প্রকৃত বর্ণালিতে একটি চূড়া থাকে এবং তার পর শক্তি কমে শূন্যের দিকে যায়। প্লাংক (1900) ধরেন: দোলকগুলো শক্তি অবিচ্ছিন্নভাবে নয়, E = nhν আকারের প্যাকেটে (কোয়ান্টা) নির্গত করে। উচ্চ কম্পাঙ্কে একটি প্যাকেটের শক্তিই (hν) এত বড় হয়ে যায় যে তাপীয় শক্তি দিয়ে সেই দোলক উত্তেজিত করাই কঠিন — ফলে উচ্চ কম্পাঙ্কের অবদান চাপা পড়ে, বর্ণালির চূড়া ও ধার দুটোই ব্যাখ্যা মেলে। এই এক অনুমান থেকেই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু — যদিও প্লাংক নিজেও প্রথমে একে গাণিতিক কৌশল ভেবেছিলেন। পরবর্তীতে আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ায় আইনস্টাইন কোয়ান্টাকে বাস্তব কণা (ফোটন) হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন।
প্রশ্ন 20: GPS সিস্টেমে আপেক্ষিকতার সংশোধন না করলে অবস্থান ভুল হয় কেন?
উত্তর: GPS স্যাটেলাইটের ঘড়িকে দুটি বিপরীতমুখী আপেক্ষিক প্রভাব টানে: (1) বিশেষ আপেক্ষিকতা — স্যাটেলাইট প্রায় 14,000 km/h বেগে চলায় তার ঘড়ি প্রতিদিন প্রায় 7 μs ধীর হয়; (2) সাধারণ আপেক্ষিকতা — ওপরের দুর্বল মহাকর্ষে ঘড়ি দ্রুত চলে, প্রায় 45 μs এগিয়ে যায়। নিট প্রভাব: স্যাটেলাইট ঘড়ি প্রতিদিন প্রায় 38 μs এগিয়ে থাকে। আলো 38 μs-এ প্রায় 11 km পথ যায় — সংশোধন না করলে অবস্থান নির্ণয়ে প্রতিদিন প্রায় 10 km ভুল জমত, GPS কয়েক ঘণ্টায়ই অকেজো হয়ে পড়ত। ইঞ্জিনিয়াররা স্যাটেলাইটের ঘড়ি উৎক্ষেপণের আগেই ইচ্ছাকৃতভাবে সামান্য ধীর করে দেন ও সফটওয়্যারে সংশোধন প্রয়োগ করেন। অর্থাৎ দৈনন্দিন প্রযুক্তির ভেতরে আইনস্টাইনের দুই তত্ত্বই প্রতিদিন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে — আপেক্ষিকতা শুধু তাত্ত্বিক কৌতূহলের বিষয় নয়।
প্রশ্ন 21: ফোটনের ভরবেগ আছে — বিকিরণ চাপ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ফোটনের স্থির ভর শূন্য হলেও তার ভরবেগ আছে: p = E/c = h/λ — কম্পটন ক্রিয়ায় ইলেকট্রনকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় এটি সরাসরি মাপা যায়। কোনো পৃষ্ঠে বিকিরণ পড়লে ফোটনগুলো ভরবেগ হস্তান্তর করে — শোষণে একবার, প্রতিফলনে দ্বিগুণ (দিক বদলায় বলে) — ফলে পৃষ্ঠে যে চাপ পড়ে তাকে বিকিরণ চাপ বলে। পৃথিবীতে এর মান অতিক্ষুদ্র (সূর্যালোকে প্রায় 10⁻⁵ N/m²), টের পাওয়া যায় না; কিন্তু মহাকাশে এটি বাস্তব: ধূমকেতুর ধূলিকণার লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে বেঁকে যাওয়ার একটি কারণ বিকিরণ চাপ, এবং সোলার সেইল মহাকাশযান এই চাপে ভর করেই চালানোর পরীক্ষা চলছে। নক্ষত্রের ভেতরে বিকিরণ চাপ মহাকর্ষের টানের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। শিক্ষা: ভরবেগ পেতে ভর থাকা জরুরি নয় — শক্তি থাকলেই চলে।
প্রশ্ন 22: কণা পদার্থবিজ্ঞানে শক্তির একক হিসেবে ইলেকট্রন-ভোল্ট (eV) সুবিধাজনক কেন?
উত্তর: একটি ইলেকট্রন 1 V বিভব পার্থক্য পেরিয়ে ত্বরিত হলে যে গতিশক্তি পায় তাই 1 eV = 1.602 × 10⁻¹⁹ J। পরমাণু ও নিউক্লিয়ার জগতের শক্তিগুলো জুলে প্রকাশ করলে অত্যন্ত ছোট দশমিক সংখ্যা আসে (আয়নায়ন শক্তি প্রায় 2 × 10⁻¹⁸ J) — হিসাব ও তুলনা দুটোই কষ্টকর। eV-তে রসায়ন-স্কেল শক্তি এসে পড়ে সুবিধাজনক সীমায়: হাইড্রোজেনের আয়নায়ন 13.6 eV, নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া MeV মাত্রার, কণা-ত্বরকের শক্তি GeV–TeV। আরেক সুবিধা: ত্বরণ বিভব সরাসরি শক্তি বলে দেয় — 50 kV X-নলে ইলেকট্রনের শক্তি 50 keV, আলাদা হিসাব লাগে না। ভরও E = mc² দিয়ে eV/c² এককে প্রকাশ করা যায় (ইলেকট্রনের ভর 0.511 MeV/c²) — শক্তি, ভর ও ভরবেগ একই ভাষায় কথা বলে, এটাই কণা পদার্থবিজ্ঞানের হিসাবকে মার্জিত করে।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল বার্তা: উচ্চ বেগে ও ক্ষুদ্র স্কেলে চিরায়ত ধারণা বদলে যায় — সময় আপেক্ষিক, শক্তি কোয়ান্টায়িত, ভর-শক্তি একই। পরের পোস্টে আসছে নবম অধ্যায় — পরমাণুর মডেল ও নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান-এর অনুধাবনমূলক ম্যারাথন।
