অনুধাবনমূলক প্রশ্নের তালিকা
- প্রশ্ন 01: রাদারফোর্ডের স্বর্ণপত্র পরীক্ষা থেকে নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব কীভাবে প্রমাণিত হয়?
- প্রশ্ন 02: রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল ব্যর্থ হয়েছিল কেন?
- প্রশ্ন 03: বোরের স্বীকার্যে কৌণিক ভরবেগের কোয়ান্টায়ন বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 04: স্থির কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে না কেন?
- প্রশ্ন 05: হাইড্রোজেন বর্ণালিতে রেখা সিরিজ সৃষ্টি হয় কেন? বামার সিরিজ দৃশ্যমান অঞ্চলে পড়ে কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
- প্রশ্ন 06: পরমাণুর শক্তিস্তরের মান ঋণাত্মক হয় কেন?
- প্রশ্ন 07: নিউক্লিয়াসের ঘনত্ব এত বিশাল হয় কেন? নিউক্লিয়াসের আকার ভর সংখ্যার ওপর কীভাবে নির্ভর করে?
- প্রশ্ন 08: আইসোটোপ, আইসোবার ও আইসোটোনের মধ্যে পার্থক্য কী?
- প্রশ্ন 09: তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের সূত্রে ক্ষয় ধ্রুবক λ বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 10: অর্ধায়ু ও গড় আয়ুর মধ্যে পার্থক্য ও সম্পর্ক কী?
- প্রশ্ন 11: বিটা ক্ষয়ে নিউট্রিনোর ধারণা প্রয়োজন হয়েছিল কেন?
- প্রশ্ন 12: তেজস্ক্রিয় ট্রেসার চিকিৎসা ও গবেষণায় কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
- প্রশ্ন 13: পরমাণু চুল্লিতে মডারেটর ব্যবহার করা হয় কেন?
- প্রশ্ন 14: নিয়ন্ত্রণ দণ্ড কীভাবে শৃঙ্খল বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখে?
- প্রশ্ন 15: ক্রান্তিক ভর বলতে কী বোঝ? শৃঙ্খল বিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হলে কী ঘটে?
- প্রশ্ন 16: পরমাণু বোমা ও পরমাণু চুল্লির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
- প্রশ্ন 17: নিউক্লিয়ার বলের বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
- প্রশ্ন 18: প্রতিটি মৌলের বর্ণালি তার আঙুলের ছাপ — এ কথা বলা হয় কেন?
- প্রশ্ন 19: বোর মডেলের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা কী কী?
- প্রশ্ন 20: ক্যান্সার চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ (রেডিওথেরাপি) কীভাবে কাজ করে?
- প্রশ্ন 21: তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমস্যা কেন?
- প্রশ্ন 22: তেজস্ক্রিয়তার একক বেকেরেল ও কুরি বলতে কী বোঝ?
প্রশ্ন 01: রাদারফোর্ডের স্বর্ণপত্র পরীক্ষা থেকে নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব কীভাবে প্রমাণিত হয়?
উত্তর: পাতলা স্বর্ণপত্রে আলফা কণা ছোড়ার পরীক্ষায় দেখা গেল: প্রায় 99.99% কণা প্রায় সোজা পথে বেরিয়ে যায়, অল্প কিছু ছোট কোণে বেঁকে যায়, আর প্রায় প্রতি 8000-এ একটি কণা 90°-এর বেশি কোণে, এমনকি প্রায় উল্টো দিকেও ছিটকে ফেরে। সোজা যাওয়া থেকে বোঝা যায় পরমাণুর বেশিরভাগ জায়গাই ফাঁকা। কিন্তু হালকা ইলেকট্রনের ধাক্কায় ভারী আলফা কণা ফিরতে পারে না — প্রায়-প্রতিক্ষেপণের মতো তীব্র বিকর্ষণের জন্য পরমাণুর সমগ্র ধনাত্মক আধান ও প্রায় সমস্ত ভর একটি অতিক্ষুদ্র, অতিঘন কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত থাকতে হবে — সেটিই নিউক্লিয়াস। বিকর্ষণ বলের হিসাব (কুলম্ব) থেকে নিউক্লিয়াসের আকারের ঊর্ধ্বসীমা প্রায় 10⁻¹⁴ m পাওয়া যায় — পরমাণুর (10⁻¹⁰ m) দশ হাজার ভাগের এক ভাগ। থমসনের প্লাম পুডিং মডেলে এত বড় বিক্ষেপণ অসম্ভব ছিল — এই এক পরীক্ষায়ই মডেলটি বাতিল হয়ে যায়।
প্রশ্ন 02: রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল ব্যর্থ হয়েছিল কেন?
উত্তর: দুটি মৌল সমস্যায়: (1) স্থিতিশীলতা — চিরায়ত তড়িৎচুম্বকত্ব অনুযায়ী কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান (অর্থাৎ ত্বরিত) ইলেকট্রনের অবিরাম শক্তি বিকিরণ করার কথা; শক্তি হারাতে হারাতে সে সর্পিল পথে প্রায় 10⁻⁸ সেকেন্ডেই নিউক্লিয়াসে গিয়ে পড়ত — পরমাণুর স্থায়ী অস্তিত্বই ব্যাখ্যা হয় না। (2) বর্ণালি — বিকিরণ অবিচ্ছিন্নভাবে বদলাত বলে বর্ণালি হতো অবিচ্ছিন্ন ফালি; কিন্তু বাস্তবে গ্যাসের বর্ণালি সুনির্দিষ্ট বিচ্ছিন্ন রেখার — মডেল তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। রাদারফোর্ডের কৃতিত্ব গঠনটি (নিউক্লিয়াস + ফাঁকা পরমাণু) ঠিক ধরায়; ব্যর্থতা সেই গঠনের ওপর চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান চাপানোয়। সমাধান দেন বোর — কক্ষপথে কোয়ান্টাম শর্ত আরোপ করে: নির্দিষ্ট কক্ষপথে ইলেকট্রন বিকিরণ করে না, বিকিরণ হয় শুধু কক্ষপথ বদলের সময়। পরবর্তীতে পূর্ণ কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বোরের শর্তগুলোকে স্বাভাবিকভাবে ব্যাখ্যা করে।
প্রশ্ন 03: বোরের স্বীকার্যে কৌণিক ভরবেগের কোয়ান্টায়ন বলতে কী বোঝ?
উত্তর: বোর ধরেন: ইলেকট্রন কেবল সেই কক্ষপথগুলোতেই থাকতে পারে যেখানে তার কৌণিক ভরবেগ L = mvr = nh/2π (n = 1, 2, 3, …) — অর্থাৎ কৌণিক ভরবেগ প্লাংক ধ্রুবকের একটি মৌলিক একক (ħ) এর পূর্ণ গুণিতক মাত্রায় কোয়ান্টায়িত। এই শর্তেই কক্ষপথের ব্যাসার্ধ ও শক্তি নির্দিষ্ট বিচ্ছিন্ন মান পায়: rₙ ∝ n², Eₙ ∝ −1/n²। দ্য ব্রগলি পরে দেখান এই শর্তের গভীর অর্থ আছে: কক্ষপথের পরিধি (2πr) ঠিক n-টি বস্তু-তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমান হলে ইলেকট্রনের তরঙ্গ নিজের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে মিলে স্থির তরঙ্গ (standing wave) তৈরি করে — অন্য ব্যাসার্ধে তরঙ্গ নিজেকেই ধ্বংস করে ফেলত। অর্থাৎ কোয়ান্টায়ন কোনো অদ্ভুত জোর-আরোপ নয়, তরঙ্গ-স্বভাবের স্বাভাবিক পরিণতি। n = 1 অবস্থাটিই ভূমি অবস্থা — সবচেয়ে স্থিতিশীল ও সবচেয়ে ছোট কক্ষপথ।
প্রশ্ন 04: স্থির কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে না কেন?
উত্তর: বোরের প্রথম স্বীকার্য ঠিক এটাই: অনুমোদিত (স্থির) কক্ষপথে ঘোরার সময় ইলেকট্রন কোনো শক্তি বিকিরণ করে না — যদিও চিরায়ত ধারণায় তার কেন্দ্রাভিমুখী ত্বরণ আছে। বিকিরণ ঘটে কেবল উচ্চ শক্তিস্তর থেকে নিম্ন শক্তিস্তরে লাফ দেওয়ার সময়, নির্গত ফোটনের শক্তি hν = Eᵢ − Eբ ঠিক স্তর দুটির শক্তি পার্থক্যের সমান। এটি স্বীকার্য হিসেবে নেওয়া হয়েছিল কারণ এ ছাড়া পরমাণুর স্থিতিশীলতা ও রেখা বর্ণালি কোনোটাই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না — আর এর ভবিষ্যদ্বাণী (হাইড্রোজেনের বর্ণালি রেখার অবস্থান) পরীক্ষায় নিখুঁতভাবে মিলে যায়। পরবর্তী কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় এর ব্যাখ্যা আসে: স্থির অবস্থায় ইলেকট্রনের তরঙ্গ-অবস্থা (দাঁড়ানো তরঙ্গ) সময়ে এমনভাবে স্থির যে আধান বণ্টন বিকিরণের মতো আচরণ করে না। মনে রাখো: বিকিরণ করে না বোরের পোস্টুলেট; পূর্ণ ব্যাখ্যাটা আরও গভীর তত্ত্বের।
প্রশ্ন 05: হাইড্রোজেন বর্ণালিতে রেখা সিরিজ সৃষ্টি হয় কেন? বামার সিরিজ দৃশ্যমান অঞ্চলে পড়ে কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ইলেকট্রন উচ্চ শক্তিস্তর (nᵢ) থেকে কোনো নির্দিষ্ট নিম্ন স্তরে (nբ) লাফ দিলে নির্গত ফোটনের কম্পাঙ্ক স্তর-জোড়ের পার্থক্য দিয়ে নির্দিষ্ট হয় — নির্দিষ্ট nբ-তে শেষ হওয়া সব লাফের রেখাগুলো মিলে একটি সিরিজ তৈরি করে: nբ = 1 লাইম্যান (অতিবেগুনি), nբ = 2 বামার (দৃশ্যমান), nբ = 3 প্যাশেন (অবলোহিত) ইত্যাদি। প্রতিটি সিরিজের রেখাগুলো একদিকে ঘন হয়ে সিরিজ-সীমায় মেশে — ইলেকট্রন অসীম থেকে ধরা পড়ার সীমা সেটি। বামার সিরিজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এটিই প্রথম আবিষ্কৃত (1885) এবং একমাত্র দৃশ্যমান সিরিজ — চোখে দেখা যায় ও সাধারণ স্পেকট্রোস্কোপে ধরা পড়ে বলে রিডবার্গ সূত্র ও বোর তত্ত্বের প্রথম যাচাই এই সিরিজ দিয়েই হয়। লাইম্যান সিরিজের জন্য UV-সংবেদী যন্ত্র লেগেছিল — আবিষ্কার তাই দেরিতে।
প্রশ্ন 06: পরমাণুর শক্তিস্তরের মান ঋণাত্মক হয় কেন?
উত্তর: শক্তির শূন্য ধরা হয় সেই অবস্থাকে যেখানে ইলেকট্রন নিউক্লিয়াস থেকে অসীম দূরত্বে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্থির — সেখানে গতিশক্তি ও বিভবশক্তি দুটোই শূন্য। আবদ্ধ অবস্থায় ইলেকট্রনকে মুক্ত করতে বাইরে থেকে শক্তি দিতে হয় (আয়নায়ন শক্তি), অর্থাৎ আবদ্ধ অবস্থার মোট শক্তি মুক্ত অবস্থার চেয়ে কম — তাই ঋণাত্মক। হাইড্রোজেনের ভূমি অবস্থায় E₁ = −13.6 eV মানে ইলেকট্রন ছাড়াতে +13.6 eV দিতেই হবে। ঋণাত্মক চিহ্নটা তাই ঘাটতি নয়, আবদ্ধতার পরিমাপ — মান যত বেশি ঋণাত্মক, বাঁধন তত শক্ত। উত্তেজিত স্তরে শক্তি বাড়ে (কম ঋণাত্মক হয়: −3.4, −1.51 eV…) এবং n → ∞ তে শূন্যের দিকে এগোয় — স্তরগুলো উপরে উঠতে ঘন হয় এই কারণেই। অবস্থান ও অভিরুচির প্রশ্নে শূন্যের পছন্দটি প্রচলন-নির্ভর; ভৌত তাৎপর্য বহন করে শক্তির পার্থক্য, যা সবসময় ধনাত্মক ফোটন আকারে মাপা যায়।
প্রশ্ন 07: নিউক্লিয়াসের ঘনত্ব এত বিশাল হয় কেন? নিউক্লিয়াসের আকার ভর সংখ্যার ওপর কীভাবে নির্ভর করে?
উত্তর: নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ R = R₀A^(1/3) (R₀ ≈ 1.2 × 10⁻¹⁵ m) — ভর সংখ্যা A বাড়লে আয়তনও A-এর সমানুপাতে বাড়ে (R³ ∝ A), আর ভরও ∝ A — ফলে ঘনত্ব প্রায় ধ্রুব থাকে, প্রায় 2.3 × 10¹⁷ kg/m³ — সব নিউক্লিয়াসেই একই মাত্রার! এই ধ্রুবকতা নিউক্লিয়ার বলের সম্পৃক্ততার ফল: প্রতিটি নিউক্লিয়ন শুধু নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গেই বল অনুভব করে, তাই উপাদান পানির অণুর মতো ঘন সন্নিবেশে থাকে। আকারের দিক থেকে: এক চা-চামচ নিউক্লিয়ার পদার্থের ভর হতো প্রায় এক বিলিয়ন টন। এই ঘনত্বই নিউট্রন নক্ষত্রের ঘনত্বের সমতুল্য — সেখানে পুরো নক্ষত্রই জমাট নিউক্লিয়ার পদার্থ। R ∝ A^(1/3) সম্পর্কটি বিক্ষেপণ পরীক্ষা থেকে প্রতিষ্ঠিত — হালকা নিউক্লিয়াসের ক্ষেত্রে সামান্য বিচ্যুতি থাকলেও সূত্রটি ভালো আসন্নীকরণ।
প্রশ্ন 08: আইসোটোপ, আইসোবার ও আইসোটোনের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: তিনটি শ্রেণী তিনটি সংখ্যার সাম্য দিয়ে চেনা হয়। আইসোটোপ: প্রোটন সংখ্যা (Z) একই, নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন — একই মৌলের ভিন্ন ভর (¹H, ²H, ³H)। রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই (Z-নির্ভর বলে), ভৌত ধর্মে সামান্য পার্থক্য থাকে — তাই রাসায়নিকভাবে আলাদা করা কঠিন। আইসোবার: ভর সংখ্যা (A) একই, Z ভিন্ন — ভিন্ন মৌল (⁴⁰Ar, ⁴⁰Ca); বিটা ক্ষয়ে নিউক্লিয়াস আইসোবারে বদলায়, বিটা বর্ণালি বিশ্লেষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ। আইসোটোন: নিউট্রন সংখ্যা একই, Z ও A ভিন্ন (³H ও ⁴He — দুটোতেই নিউট্রন 2)। মনে রাখার কৌশল: আইসোটোপে প মানে প্রোটন সমান, আইসোবারে বার মানে ভর (A) সমান, আইসোটোনে ন মানে নিউট্রন সমান। চিকিৎসা ও গবেষণায় কৃত্রিম আইসোটোপের ব্যবহার ব্যাপক — একই রসায়ন ধরে দেহে প্রবেশ করিয়ে তেজস্ক্রিয়তা দিয়ে তা অনুসরণ করা যায়।
প্রশ্ন 09: তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের সূত্রে ক্ষয় ধ্রুবক λ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ক্ষয় সূত্র N = N₀e^(−λt)-এ λ হলো প্রতি একক সময়ে একটি নিউক্লিয়াসের ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা — একক s⁻¹। একটি নমুনায় প্রতি সেকেন্ডে ক্ষয়ের সংখ্যা (ক্রিয়াশীলতা) A = λN — নিউক্লিয়াস যত বেশি, ক্ষয়ও তত বেশি; জনসংখ্যা কমতে কমতে ক্ষয়ের হারও সমানুপাতে কমে যায় বলেই ক্ষয় সূচকীয় (exponential) হয়, রৈখিক নয়। λ বড় মানে আইসোটোপটি স্বল্পজীবী (দ্রুত ক্ষয় হয়, বেশি সক্রিয়) — অর্ধায়ু T½ = ln2/λ ও গড় আয়ু τ = 1/λ দিয়ে λ-র সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গুরুত্বপূর্ণ: λ তাপমাত্রা, চাপ বা রাসায়নিক অবস্থা দিয়ে বদলানো যায় না — প্রতিটি নিউক্লিয়াসের ঘড়ি স্বতন্ত্র ও পরিবেশ-অনপেক্ষ; এই ধ্রুবতাই রেডিওমেট্রিক ডেটিংয়ের ভিত্তি। প্রতিটি ক্ষয় ঘটনা সম্পূর্ণ এলোমেলো — λ শুধু সমষ্টির আচরণই নির্দেশ করে।
প্রশ্ন 10: অর্ধায়ু ও গড় আয়ুর মধ্যে পার্থক্য ও সম্পর্ক কী?
উত্তর: অর্ধায়ু (T½) হলো প্রারম্ভিক নিউক্লিয়াস সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসতে প্রয়োজনীয় সময়: T½ = ln2/λ ≈ 0.693/λ। গড় আয়ু (τ) হলো সব নিউক্লিয়াসের আয়ুষ্কালের গড় — একটি নিউক্লিয়াস গড়ে কতক্ষণ টেকে: τ = 1/λ। সুতরাং τ = T½/0.693 ≈ 1.44 × T½ — গড় আয়ু অর্ধায়ুর চেয়ে প্রায় 44% বেশি। কেন বেশি? ক্ষয়-বণ্টন সূচকীয়: বেশিরভাগ নিউক্লিয়াস আগেভাগেই ক্ষয় হলেও একটি ক্ষুদ্র অংশ বহুগুণ বেশি সময় টিকে গড়টাকে টেনে ওপরে তোলে — ঠিক যেমন মানুষের গড় আয়ু আর অর্ধেক মানুষ মারা যাওয়ার বয়স এক নয়। ব্যবহারে অর্ধায়ুই বেশি প্রচলিত কারণ মাপা সহজ ও সরাসরি বোধগম্য; গড় আয়ু তাত্ত্বিক হিসাবে (ক্ষয় সমীকরণে e^(−t/τ) আকারে) সুবিধাজনক। দুটোই λ-এর অন্য নাম মাত্র — একটি জানলেই বাকি দুটো পাওয়া যায়।
প্রশ্ন 11: বিটা ক্ষয়ে নিউট্রিনোর ধারণা প্রয়োজন হয়েছিল কেন?
উত্তর: বিটা ক্ষয়ে নির্গত ইলেকট্রনের শক্তি একটি নির্দিষ্ট মান না হয়ে শূন্য থেকে একটি সর্বোচ্চ মান পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন বর্ণালিতে পাওয়া যায় — অথচ নিউক্লিয়াসের দুটি নির্দিষ্ট শক্তিস্তরের মধ্যে রূপান্তরে ইলেকট্রনের একটিমাত্র নির্দিষ্ট শক্তি পাওয়ার কথা ছিল। ফলে শক্তি ও ভরবেগ সংরক্ষণ ভেঙে পড়ার সঙ্কট দেখা দেয় — নীলস বোর পর্যন্ত শক্তি-সংরক্ষণকে পরিসংখ্যানগত বলে মানতে প্রস্তুত ছিলেন। পাউলি (1930) প্রস্তাব করেন: অদৃশ্য একটি তৃতীয় কণাও নির্গত হয়, যা বাকি শক্তি-ভরবেগ বহন করে নেয় — ক্ষুদ্র, আধানহীন, প্রায় ভরহীন এই কণাই নিউট্রিনো। তত্ত্ব বাঁচলেও কণাটি এতই কম মিথস্ক্রিয়া করে যে সরাসরি শনাক্ত করতে 1956 সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। শিক্ষা: সংরক্ষণ সূত্রে গরমিল দেখা দিলে নতুন কণার ভবিষ্যদ্বাণী পদার্থবিজ্ঞানের শক্তিশালী পদ্ধতি — পজিট্রন আবিষ্কারও একই ধারার।
প্রশ্ন 12: তেজস্ক্রিয় ট্রেসার চিকিৎসা ও গবেষণায় কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: ট্রেসার হলো এমন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ যা রাসায়নিকভাবে সাধারণ মৌলের মতোই আচরণ করে — দেহ বা ব্যবস্থায় ঢুকিয়ে দিলে সাধারণ পদার্থের পথেই চলে, কিন্তু তার বিকিরণ বাইরে থেকে শনাক্ত করে চলাচল, জমা হওয়া ও বিপাক অনুসরণ করা যায়। উদাহরণ: ¹³¹I থাইরয়েডে জমে বলে থাইরয়েডের কার্যকারিতা ও রোগ নির্ণয়ে; ⁹⁹ᵐTc স্বল্প অর্ধায়ু (6 ঘণ্টা) ও সুবিধাজনক গামা শক্তির জন্য মেডিকেল ইমেজিংয়ে সর্বাধিক ব্যবহৃত; গবেষণায় ³²P দিয়ে উদ্ভিদে ফসফেট গ্রহণের পথ, ¹⁴C দিয়ে সালোকসংশ্লেষণের ধাপ মাপা হয়েছে। ট্রেসার বাছাইয়ের শর্ত: অর্ধায়ু যথেষ্ট ছোট (রোগীর বিকিরণ-মাত্রা কম) কিন্তু পরীক্ষা শেষ করার মতো যথেষ্ট লম্বা; বিকিরণ দেহের বাইরে থেকে শনাক্তযোগ্য (গামা পছন্দনীয়)। একই নীতি শিল্পে পাইপের লিকেজ শনাক্তকরণেও ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন 13: পরমাণু চুল্লিতে মডারেটর ব্যবহার করা হয় কেন?
উত্তর: ফিশনে নির্গত নিউট্রন হয় দ্রুতগামী (প্রায় 2 MeV শক্তির) — কিন্তু ²³⁵U-এর ফিশন ধরার ক্ষমতা (ক্রস-সেকশন) ধীর, তাপীয় নিউট্রনের (প্রায় 0.025 eV) জন্য ছয়শো গুণেরও বেশি। দ্রুত নিউট্রন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফিশন না ঘটিয়ে ²³⁸U-তে শোষিত হয়ে যায় বা চুল্লি থেকে বেরিয়ে যায় — শৃঙ্খল চলতেই পারে না। মডারেটর (সাধারণ পানি, ভারী পানি D₂O, গ্রাফাইট) নিউট্রনের সঙ্গে বারবার স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষে তার গতি কমিয়ে তাপীয় মাত্রায় নামিয়ে আনে। ভালো মডারেটরের শর্ত: হালকা নিউক্লিয়াস (সংঘর্ষে শক্তি হস্তান্তর বেশি — হাইড্রোজেন সবচেয়ে ভালো) কিন্তু নিজে নিউট্রন শোষণ কম করে (সাধারণ পানির এই ঘাটতি থাকায় সমৃদ্ধ জ্বালানি লাগে; ভারী পানি শোষণ প্রায় করে না বলে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামেই চলে — CANDU চুল্লির ভিত্তি এটাই)। মডারেটর ছাড়া বাণিজ্যিক চুল্লির শৃঙ্খল বিক্রিয়া সম্ভবই হতো না।
প্রশ্ন 14: নিয়ন্ত্রণ দণ্ড কীভাবে শৃঙ্খল বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখে?
উত্তর: প্রতিটি ফিশনে গড়ে 2–3টি নিউট্রন বের হয়; চুল্লি স্থির শক্তিতে চলতে হলে প্রতি ফিশনের ঠিক একটি নিউট্রনই পরের ফিশন ঘটাতে হবে (গুণক k = 1) — একটির বেশি হলেই শক্তি দ্রুতগতিতে বেড়ে বিস্ফোরক পরিস্থিতি, কম হলে চুল্লি নিভে যায়। নিয়ন্ত্রণ দণ্ড বোরন বা ক্যাডমিয়াম দিয়ে তৈরি — এরা নিউট্রনের প্রবল শোষক। দণ্ড চুল্লির কেন্দ্রে (core) যত ঢোকানো হয়, তত বেশি নিউট্রন শোষিত হয়ে k কমে; বের করলে k বাড়ে। অপারেটর এই সামঞ্জস্যে চুল্লির শক্তি স্থির রাখেন। জরুরি অবস্থায় দণ্ড পুরোপুরি ফেলে দেওয়া (SCRAM) হয় — সেকেন্ডের মধ্যে শৃঙ্খল বন্ধ। গুরুত্বপূর্ণ ভৌত সুবিধা: বিলম্বিত নিউট্রনের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ (প্রায় 0.65%) বিক্রিয়ার সময়-মাত্রাকে সেকেন্ডের স্কেলে নামিয়ে আনে — তা না হলে মানব-নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব দ্রুত হয়ে যেত।
প্রশ্ন 15: ক্রান্তিক ভর বলতে কী বোঝ? শৃঙ্খল বিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হলে কী ঘটে?
উত্তর: ফিশনযোগ্য পদার্থের একটি অংশ থেকে কিছু নিউট্রন পৃষ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে যায় (লিকেজ) — অংশটি খুব ছোট হলে পৃষ্ঠ/আয়তন অনুপাত বড় বলে লিকেজ বেশি হয় ও শৃঙ্খল টেকে না। যে ন্যূনতম ভরে উৎপাদন ও লিকেজ+শোষণের ক্ষতি সমান হয়ে শৃঙ্খল নিজে নিজে টিকে থাকে (k = 1), তাকে ক্রান্তিক ভর বলে — ²³⁵U-এর খোলা গোলকের ক্ষেত্রে প্রায় 52 kg। ক্রান্তিক ভর কোনো ধ্রুবক নয়: প্রতিফলক (reflector) দিয়ে ঘিরলে লিকেজ কমে ক্রান্তিক ভর কমে যায়, ঘনত্ব বাড়ালেও কমে। ক্রান্তিকের বেশি ভর হলে (k > 1) প্রতিটি প্রজন্মে ফিশন সংখ্যা গুণিতক হারে বাড়ে — মাইক্রোসেকেন্ডে বিপুল শক্তি একসঙ্গে মুক্ত হয়ে বিস্ফোরণ ঘটে — পরমাণু বোমার নীতি এটাই। চুল্লিতে জ্বালানি এমনভাবে ছড়িয়ে রাখা হয় যাতে কোনো অবস্থাতেই এই আকস্মিক ক্রান্তিকতা আসতে না পারে।
প্রশ্ন 16: পরমাণু বোমা ও পরমাণু চুল্লির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: দুটোতেই ফিশন শৃঙ্খল বিক্রিয়া — পার্থক্য নিয়ন্ত্রণে ও জ্বালানির সমৃদ্ধতায়। চুল্লি: জ্বালানিতে ²³⁵U মাত্র 3–5%, মডারেটর ও নিয়ন্ত্রণ দণ্ডে k ঠিক 1-এ ধরে রাখা হয়, বিক্রিয়া চলে ধীরে ও স্থির শক্তিতে, তাপ বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। বোমা: প্রায় বিশুদ্ধ (>90%) ফিশনযোগ্য পদার্থের দুটি অনু-ক্রান্তিক খণ্ডকে বিস্ফোরক ধাক্কায় মুহূর্তে একত্র করে সুপার-ক্রান্তিক ভর তৈরি করা হয় — কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই নেই, k >> 1 — শৃঙ্খল অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে পুরো জ্বালানি মাইক্রোসেকেন্ডে বিক্রিয়া করে বিস্ফোরণ ঘটে। অর্থাৎ রসায়ন/পদার্থ এক, প্রকৌশল দর্শন সম্পূর্ণ বিপরীত: একটির লক্ষ্য শক্তিকে বশে রাখা, অপরটির মুক্ত করে দেওয়া। মজার তথ্য: চুল্লির জ্বালানি দিয়ে বোমা বানানো যায় না — সমৃদ্ধতা এতটাই কম যে শৃঙ্খল বিস্ফোরক গতিতে বাড়তেই পারে না।
প্রশ্ন 17: নিউক্লিয়ার বলের বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
উত্তর: নিউক্লিয়াসের ভেতরে প্রোটনগুলোর মধ্যে প্রবল কুলম্ব বিকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও নিউক্লিয়নগুলো বাঁধা থাকে শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বলের জন্য। এর বৈশিষ্ট্য: (1) স্বল্প পাল্লা — মাত্র প্রায় 2 × 10⁻¹⁵ m পর্যন্ত কার্যকর, তার বাইরে হঠাৎ শূন্য; এই কারণেই বড় নিউক্লিয়াস অস্থিতিশীল (দূরের প্রোটনদের বিকর্ষণ জমতে থাকে, বল পৌঁছায় না)। (2) সম্পৃক্ততা — প্রতিটি নিউক্লিয়ন শুধু নিকটতম প্রতিবেশীদের আকর্ষণ করে, সবার সঙ্গে নয় — তাই বন্ধন শক্তি ∝ A এবং নিউক্লিয়ার ঘনত্ব ধ্রুব। (3) আধান-নিরপেক্ষ — p–p, n–n ও p–n আকর্ষণ প্রায় সমান শক্তির। (4) অত্যন্ত শক্তিশালী — কুলম্ব বলের চেয়ে প্রায় 100 গুণ। (5) স্পিন-নির্ভর। নিউক্লিয়ার বলের এই চরিত্রই ব্যাখ্যা করে কেন A > প্রায় 210-এর সব নিউক্লিয়াস তেজস্ক্রিয় এবং কেন পর্যায় সারণি সসীম।
প্রশ্ন 18: প্রতিটি মৌলের বর্ণালি তার আঙুলের ছাপ — এ কথা বলা হয় কেন?
উত্তর: প্রতিটি মৌলের ইলেকট্রন-শক্তিস্তরের বিন্যাস তার পারমাণবিক সংখ্যা দিয়ে অনন্যভাবে নির্ধারিত — ফলে সম্ভাব্য শক্তি-পার্থক্য, অর্থাৎ নির্গত/শোষিত ফোটনের কম্পাঙ্কের সেট, প্রতিটি মৌলের জন্য সুস্পষ্ট ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য। দুটি ভিন্ন মৌলের রেখা-বিন্যাস কখনোই এক হয় না — আঙুলের ছাপের মতোই প্রতিটি স্বতন্ত্র। ব্যবহারিক শক্তি এখানে: নমুনা ধ্বংস না করে, এমনকি কোটি আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করেও তার রাসায়নিক গঠন জানা যায়। হিলিয়াম প্রথম আবিষ্কৃত হয় সূর্যের বর্ণালিতে (1868) — পৃথিবীতে পাওয়ার আগেই; নামটাও সূর্য (helios) থেকে। অজানা নমুনা শনাক্তকরণ, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ফরেনসিকে বর্ণালি-বিশ্লেষণের ভিত্তি এই অনন্যতা। সতর্কতা: আয়নিত অবস্থা বদলালে (পরমাণু বনাম আয়ন) বর্ণালিও বদলায় — ছাপটি প্রজাতি-নির্দিষ্ট।
প্রশ্ন 19: বোর মডেলের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা কী কী?
উত্তর: সাফল্য: (1) হাইড্রোজেন বর্ণালির সব সিরিজের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী (রিডবার্গ ধ্রুবকের মান তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসে); (2) পরমাণুর আকারের সঠিক মাত্রা (বোর ব্যাসার্ধ প্রায় 0.53 Å) ও আয়নায়ন শক্তি (13.6 eV); (3) হাইড্রোজেন-সদৃশ আয়নের (He⁺, Li²⁺) বর্ণালিও ব্যাখ্যা করে; (4) শক্তিস্তর ধারণা — ফ্রাংক-হার্টজ পরীক্ষায় যার সরাসরি প্রমাণ মেলে। সীমাবদ্ধতা: (1) একের বেশি ইলেকট্রনবিশিষ্ট পরমাণুর বর্ণালি ব্যাখ্যায় ব্যর্থ — ইলেকট্রন-ইলেকট্রন বিকর্ষণ সামলাতে পারে না; (2) বর্ণালি রেখার আপেক্ষিক তীব্রতা বা সূক্ষ্ম গঠন (fine structure) ব্যাখ্যা করতে পারে না; (3) বৃত্তাকার কক্ষপথের ধারণা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্ভাবনা-মেঘ চিত্রের সঙ্গে মেলে না; (4) রাসায়নিক বন্ধন বা অণুর গঠনে অকার্যকর। তবু বোর মডেল ইতিহাসের মাইলফলক — কোয়ান্টায়িত শক্তিস্তরের ধারণাটি পরবর্তী পূর্ণ তত্ত্বেও টিকে গেছে।
প্রশ্ন 20: ক্যান্সার চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ (রেডিওথেরাপি) কীভাবে কাজ করে?
উত্তর: তেজস্ক্রিয় বিকিরণ জীবিত কোষের DNA ভেঙে দেয় — বিভাজনশীল কোষ এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর ক্যান্সার কোষ স্বাভাবিক কোষের চেয়ে দ্রুত বিভাজিত হয় বলেই আপেক্ষিকভাবে বেশি মারা যায়। দুটি পদ্ধতি: (1) বাহ্যিক রশ্মি — ⁶⁰Co-এর (অর্ধায়ু 5.27 বছর) শক্তিশালী গামা রশ্মি বা ত্বরকযন্ত্রের X-রশ্মি বাইরে থেকে টিউমারে নির্ভুলভাবে লক্ষ্য করা হয়, গামার ভেদন ক্ষমতা বেশি বলে গভীরের টিউমারেও পৌঁছায়; (2) অভ্যন্তরীণ — ¹³¹I থাইরয়েড ক্যান্সারে মুখে খাওয়ানো হয়, আইসোটোপটি স্বাভাবিক বিপাকেই থাইরয়েডে জমে সেখানকার কোষ ধ্বংস করে; টিউমারের কাছে সূত্র বসিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিও (brachytherapy) আছে। মূল সূক্ষ্মতা ডোজের হিসাবে — টিউমার মারা ও আশেপাশের সুস্থ কলা বাঁচানোর ভারসাম্য, একাধিক দিক থেকে রশ্মি দিয়ে এই ভারসাম্য রাখা হয়। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণও একই পদার্থবিজ্ঞান: পথে থাকা সুস্থ কোষও কিছু মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রশ্ন 21: তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমস্যা কেন?
উত্তর: চুল্লির ব্যবহৃত জ্বালানিতে থাকে ফিশন-খণ্ড ও অ্যাক্টিনাইড, যাদের অনেকের অর্ধায়ু শত থেকে হাজারো বছর (²³⁹Pu-এর 24,000 বছর) — বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয়তা নিরাপদ মাত্রায় নামতে ভূতাত্ত্বিক সময় লাগে। সমস্যার মাত্রা তিনটি: (1) সময় — কোনো মানব প্রতিষ্ঠান 10,000 বছরের তদারকির নিশ্চয়তা দিতে পারে না; (2) তাপ — উচ্চ-স্তরের বর্জ্য ক্ষয়-তাপ উৎপন্ন করে চলে, সক্রিয় শীতলীকরণ লাগে প্রথম দশকগুলোতে; (3) সুরক্ষা — উপাদান চুরি বা বিস্তার রোধে প্রহরা ও ভেদন-রোধী আবদ্ধন চাই। গৃহীত সমাধান: বর্জ্যকে কাচে জমাট (vitrification) করে গভীর ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীল শিলা-গঠনে (deep geological repository) সংরক্ষণ — ফিনল্যান্ডের অনকালো প্রথম বাস্তব উদাহরণ। তুলনায় ফিউশন বর্জ্য অনেক স্বল্পজীবী — পারমাণবিক প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ-বিতর্কে বর্জ্যই অন্যতম প্রধান যুক্তি।
প্রশ্ন 22: তেজস্ক্রিয়তার একক বেকেরেল ও কুরি বলতে কী বোঝ?
উত্তর: তেজস্ক্রিয়তার (ক্রিয়াশীলতার) SI একক বেকেরেল (Bq): প্রতি সেকেন্ডে একটি ক্ষয় ঘটলে উৎসের ক্রিয়াশীলতা 1 Bq। এটি বেশ ছোট একক — বাস্তব উৎসগুলো সাধারণত MBq–GBq মাত্রার হয়। পুরনো প্রচলিত একক কুরি (Ci): এক গ্রাম রেডিয়ামের ক্রিয়াশীলতার ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত — 1 Ci = 3.7 × 10¹⁰ Bq, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে 37 বিলিয়ন ক্ষয়। কুরির জন্ম রেডিয়াম গবেষণার যুগে (মেরি কুরির নামে) — আজ অফিসিয়ালি Bq ব্যবহৃত হলেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে Ci/mCi এখনো শোনা যায়। খেয়াল রাখো: ক্রিয়াশীলতা আর শোষিত ডোজ এক জিনিস নয় — ডোজের একক গ্রে (Gy, প্রতি কেজিতে শোষিত জুল) ও সিভার্ট (Sv, জৈবিক প্রভাবসহ)। ক্ষয়ের সংখ্যা বেশি হলেই ক্ষতি সমানুপাতিক নয় — কণার ধরন ও শক্তির ওপরও নির্ভর করে — ডোজ-হিসাবে এই পার্থক্য অপরিহার্য।
পরমাণুর মডেল ও নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের মূল বার্তা: একটি ক্ষুদ্র ঘন নিউক্লিয়াস, কোয়ান্টায়িত শক্তিস্তর আর বন্ধন শক্তির হিসাব — এই তিন ধারণা দিয়েই পরমাণু জগতের প্রায় সব ঘটনা পড়া যায়। পরের পোস্টে আসছে দশম অধ্যায় — সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স-এর অনুধাবনমূলক ম্যারাথন।
