পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের একাদশ অধ্যায় — জ্যোতির্বিজ্ঞান। নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয় কীভাবে, মহাবিশ্ব ছড়িয়ে যাচ্ছে তা বোঝা গেল কীভাবে, কৃষ্ণগহ্বর থেকে আলোও পালাতে পারে না কেন — এই অধ্যায়ের অনুধাবনমূলক প্রশ্নগুলো টেলিস্কোপ, নক্ষত্রের জীবনচক্র ও মহাবিশ্বের গঠন ঘিরে। এই পোস্টে অধ্যায়ের সব গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর একসাথে সাজানো হয়েছে — বোর্ড পরীক্ষা ও কলেজ টেস্ট পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে। প্রতিটি উত্তর ২ নম্বরের উপযোগী করে সংক্ষিপ্ত ও ধারণা-নির্ভর করে লেখা।
অনুধাবনমূলক প্রশ্নের তালিকা
- প্রশ্ন 01: প্রতিসরক ও প্রতিফলক টেলিস্কোপের মধ্যে পার্থক্য কী? বড় টেলিস্কোপগুলো প্রতিফলক ধরনের হয় কেন?
- প্রশ্ন 02: প্যারালাক্স পদ্ধতিতে নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয় কীভাবে? পারসেক বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 03: আলোকবর্ষ ও পারসেকের মধ্যে পার্থক্য কী? দূরের গ্যালাক্সির দূরত্ব প্যারালাক্সে মাপা যায় না কেন?
- প্রশ্ন 04: নক্ষত্রের আপাত প্রভা (magnitude) স্কেল লগারিদমিক কেন? প্রভা ও দীপ্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
- প্রশ্ন 05: লাল সরণ ও হাবলের সূত্র মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের প্রমাণ কেন?
- প্রশ্ন 06: বিগ ব্যাং তত্ত্বের পক্ষে প্রধান প্রমাণগুলো কী কী?
- প্রশ্ন 07: মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (CMB) বলতে কী বোঝ? এর তাপমাত্রা মাত্র 2.7 K কেন?
- প্রশ্ন 08: নক্ষত্র জন্ম নেয় কীভাবে? মূল ধারার নক্ষত্র বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 09: লাল দৈত্য ও শ্বেত বামন কী? সূর্যের ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হবে?
- প্রশ্ন 10: সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে কেন? ভারী মৌল তৈরিতে এর ভূমিকা কী?
- প্রশ্ন 11: কৃষ্ণগহ্বর থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না কেন? ঘটনা দিগন্ত বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 12: নিউট্রন নক্ষত্র ও পালসার বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 13: ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের প্রমাণ কী? তা “ডার্ক” কেন?
- প্রশ্ন 14: ডার্ক এনার্জি বলতে কী বোঝ? মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ত্বরণশীল জানা গেল কীভাবে?
- প্রশ্ন 15: মহাকাশে টেলিস্কোপ বসানোর সুবিধা কী? জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ অবলোহিত রশ্মিতে কাজ করে কেন?
- প্রশ্ন 16: রেডিও টেলিস্কোপ দিনের বেলায়ও পর্যবেক্ষণ করতে পারে কেন? এর আয়না এত বড় হয় কেন?
- প্রশ্ন 17: ডপলার প্রভাব জ্যোতির্বিজ্ঞানে কীভাবে ব্যবহৃত হয়? বহিঃগ্রহ (exoplanet) খোঁজায় এর ভূমিকা কী?
- প্রশ্ন 18: নক্ষত্রের বর্ণালি শ্রেণি (O, B, A, F, G, K, M) কীসের ভিত্তিতে করা হয়?
- প্রশ্ন 19: বাসযোগ্য অঞ্চল (habitable zone) বলতে কী বোঝ?
- প্রশ্ন 20: হাবল ধ্রুবক থেকে মহাবিশ্বের বয়স অনুমান করা হয় কীভাবে?
- প্রশ্ন 21: মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আমরা নিজেদের অবস্থান জানি কীভাবে? গ্যালাক্সির পুরো ছবি তোলা যায় না কেন?
- প্রশ্ন 22: টেলিস্কোপের বিচ্ছেদন ক্ষমতা ও আলো-সংগ্রহ ক্ষমতা দুটোই বড় আয়নায় বাড়ে কেন?
প্রশ্ন 01: প্রতিসরক ও প্রতিফলক টেলিস্কোপের মধ্যে পার্থক্য কী? বড় টেলিস্কোপগুলো প্রতিফলক ধরনের হয় কেন?
উত্তর: প্রতিসরক টেলিস্কোপে অভিলক্ষ্য হিসেবে লেন্স থাকে — আলো প্রতিসরিত হয়ে ফোকাসে মিলিত হয়; প্রতিফলকে থাকে অবতল দর্পণ — আলো প্রতিফলিত হয়ে ফোকাস পায়। বড় টেলিস্কোপ প্রতিফলক হওয়ার কারণগুলো বাস্তবিক: (1) বড় লেন্স বানানো কঠিন — নিজের ওজনে ঝুলে যায়, শুধু কিনারা ধরে রাখা যায়, আর আলো লেন্সের ভেতর দিয়ে যাওয়ায় কাচের নিখুঁত স্বচ্ছতা ও সমসত্ত্বতা লাগে; দর্পণকে পুরো পেছন থেকে সাপোর্ট দেওয়া যায় ও আলো শুধু পৃষ্ঠ ছুঁয়ে ফেরে। (2) লেন্সে বর্ণ বিভ্রম (chromatic aberration) থাকে — ভিন্ন বর্ণ ভিন্ন ফোকাসে যায়; দর্পণে সব বর্ণ একই আইনে প্রতিফলিত হয়, এই ত্রুটি নেই। (3) সমান আকারে দর্পণ সস্তা ও হালকা। বিশ্বের সব বৃহৎ গবেষণা টেলিস্কোপই তাই প্রতিফলক — প্রতিসরক টিকে আছে ছোট শৌখিন যন্ত্রে।
প্রশ্ন 02: প্যারালাক্স পদ্ধতিতে নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয় কীভাবে? পারসেক বলতে কী বোঝ?
উত্তর: পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরায় ছয় মাসের ব্যবধানে পর্যবেক্ষণ অবস্থান বদলায় (ভিত্তিরেখা 2 AU)। কাছের নক্ষত্রটি দূরের নক্ষত্রগুলোর পটভূমির সাপেক্ষে সামান্য সরে দেখায় — এই কৌণিক সরণের অর্ধেকই বার্ষিক প্যারালাক্স কোণ (p)। জ্যামিতি থেকে দূরত্ব d = 1/p (p আর্কসেকেন্ডে হলে d পারসেকে)। যে দূরত্বে প্যারালাক্স ঠিক 1 আর্কসেকেন্ড, তাকে 1 পারসেক (pc) বলে = 3.26 আলোকবর্ষ ≈ 3.09 × 10¹⁶ m। সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রের (প্রক্সিমা সেন্টৌরি) প্যারালাক্স মাত্র 0.77″। পদ্ধতিটির সীমা: কোণ ক্রমশ ছোট হয় — ভূমি থেকে প্রায় 100 pc, মহাকাশ টেলিস্কোপ (Gaia) দিয়ে হাজারো pc পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য; এর বেশি দূরত্বে অন্য “সিঁড়ি” (standard candle) ব্যবহার করা হয়।
প্রশ্ন 03: আলোকবর্ষ ও পারসেকের মধ্যে পার্থক্য কী? দূরের গ্যালাক্সির দূরত্ব প্যারালাক্সে মাপা যায় না কেন?
উত্তর: আলোকবর্ষ হলো দূরত্বের একক — আলো এক বছরে যে দূরত্ব যায় (প্রায় 9.46 × 10¹⁵ m) — নামে “বর্ষ” থাকলেও এটি সময়ের একক নয়, এটাই সবচেয়ে সাধারণ ভুল ধারণা। পারসেক তার চেয়ে বড় একক (1 pc = 3.26 ly), প্যারালাক্স পরিমাপ থেকে সরাসরি আসে বলে পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানে এটি বেশি ব্যবহৃত হয়। গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে প্যারালাক্স অকেজো হওয়ার কারণ: দূরত্ব লক্ষ-কোটি pc হলে প্যারালাক্স কোণ 10⁻⁶ আর্কসেকেন্ডেরও কম — যেকোনো যন্ত্রের মাপন সূক্ষ্মতার বহু নিচে; মাপার ত্রুটি সংকেতকেই ডুবিয়ে দেয়। তখন ধাপে ধাপে এগোতে হয়: প্যারালাক্স → সিফিড চলক নক্ষত্রের দীপ্তি-পর্যায়কাল সম্পর্ক → সুপারনোভার স্বকীয় উজ্জ্বলতা → হাবলের সূত্র। এই শৃঙ্খলকেই cosmic distance ladder বলে — প্রতিটি ধাপ আগের ধাপ দিয়ে ক্রমাঙ্কিত (calibrated)।
প্রশ্ন 04: নক্ষত্রের আপাত প্রভা (magnitude) স্কেল লগারিদমিক কেন? প্রভা ও দীপ্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: প্রভা স্কেলের উৎস প্রাচীন চোখের শ্রেণিবিন্যাস (হিপারকাস) — চোখের সংবেদনশীলতা নিজেই লগারিদমিক (শক্তি দ্বিগুণ হলে উজ্জ্বলতা সামান্য বেশি মনে হয়)। আধুনিক সংজ্ঞায় 5 মাত্রার পার্থক্য মানে উজ্জ্বলতার (flux) ঠিক 100 গুণ পার্থক্য — প্রতি 1 মাত্রা প্রায় 2.512 গুণ। স্কেলটি উল্টো ধাঁচের: সংখ্যা যত ছোট, নক্ষত্র তত উজ্জ্বল; সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের প্রভা ঋণাত্মকও হয় (সিরিয়াস −1.46) — চোখে দেখার সীমা প্রায় +6। পার্থক্য: আপাত প্রভা পৃথিবী থেকে দেখা উজ্জ্বলতা — দূরত্বের ওপর নির্ভরশীল; দীপ্তি (luminosity) নক্ষত্রের প্রকৃত মোট বিকিরণ শক্তি — তার নিজস্ব গুণ। একই প্রভার দুটি নক্ষত্রের দীপ্তি হাজার গুণ আলাদা হতে পারে — দূরের অতিদানব ও কাছের বামনের প্রভা মিলে যেতে পারে। দূরত্ব জানলে আপাত প্রভা থেকে পরম প্রভা (= 10 pc দূরত্বে কল্পিত প্রভা) ও দীপ্তি দুটোই বের করা যায়।
প্রশ্ন 05: লাল সরণ ও হাবলের সূত্র মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের প্রমাণ কেন?
উত্তর: দূরের গ্যালাক্সির বর্ণালি রেখাগুলো সব লাল দিকে (দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে) সরে যায় — ডপলার ব্যাখ্যায় এর অর্থ গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। হাবল দেখান: অপসারণ বেগ দূরত্বের সমানুপাতিক (v = H₀d) — কাছে ধীরে, দূরে দ্রুত। এই ধাঁচ কোনো কেন্দ্র থেকে বিস্ফোরণে ছিটকে যাওয়ার নয়; এটি নিজে স্থান (space) প্রসারিত হওয়ার বৈশিষ্ট্য — বেলুনের গায়ে আঁকা বিন্দুগুলো ফুলানোর সময় যেমন পরস্পর থেকে দূরে সরে, তেমনি প্রতিটি গ্যালাক্সি থেকেই অন্যগুলো একই নিয়মে অপসারিত দেখা যায় — কেন্দ্র বা বিশেষ অবস্থান কারো নেই। তরঙ্গদৈর্ঘ্যও প্রসারণের সঙ্গে বেড়ে যায় (cosmological redshift) — আলো ভ্রমণের সময় স্থান ফুলে তার তরঙ্গ প্রসারিত হয়। পেছনে ফিরে হিসাব করলে সব পদার্থ একসময় এক বিন্দুতে ঘন ছিল — বিগ ব্যাং চিত্র। নিজের গ্যালাক্সিগুচ্ছের ভেতরে পারস্পরিক মহাকর্ষে বাঁধা গ্যালাক্সিরা এই সম্প্রসারণে অংশ নেয় না — অ্যান্ড্রোমিডা বরং নীল সরণ দেখিয়ে এগিয়ে আসছে।
প্রশ্ন 06: বিগ ব্যাং তত্ত্বের পক্ষে প্রধান প্রমাণগুলো কী কী?
উত্তর: তিনটি স্তম্ভ: (1) হাবলের সম্প্রসারণ — গ্যালাক্সিদের পারস্পরিক অপসারণ পেছনে এক্সট্রাপোলেট করলে ঘন, উত্তপ্ত আদি-অবস্থা পাওয়া যায়। (2) মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (CMB) — আদি উত্তপ্ত মহাবিশ্বের অবশিষ্ট আভা, যা তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী প্রায় 3 K-এ ঠান্ডা হয়ে আজ সব দিক থেকে আসছে; বিকল্প “স্থির অবস্থা” তত্ত্ব এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। (3) হালকা মৌলের প্রাচুর্য — আদি কয়েক মিনিটের নিউক্লিয় সংশ্লেষণে হিলিয়াম-4, ডিউটেরিয়াম ও লিথিয়ামের যে অনুপাত তৈরি হওয়ার কথা, পর্যবেক্ষণে হুবহু তাই পাওয়া যায় — এমনকি সবচেয়ে প্রাচীন গ্যাস-মেঘেও ভরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হিলিয়াম, যা নক্ষত্রে তৈরি হতে পারত না। তিনটি স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ একই ছবি দেখায় বলেই বিগ ব্যাং আধুনিক কসমোলজির ভিত্তি — উল্লেখ্য, “ব্যাং” নামটি বিভ্রান্তিকর: এটি স্থানে কোনো বিস্ফোরণ নয়, স্বয়ং স্থানের প্রসারণের শুরু।
প্রশ্ন 07: মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (CMB) বলতে কী বোঝ? এর তাপমাত্রা মাত্র 2.7 K কেন?
উত্তর: বিগ ব্যাং-এর প্রায় 380,000 বছর পর মহাবিশ্ব ঠান্ডা হয়ে প্রায় 3000 K-এ নামলে প্রোটন-ইলেকট্রন মিলে নিরপেক্ষ পরমাণু তৈরি হয় — মহাবিশ্ব স্বচ্ছ হয়ে যায় এবং সেসময়ের আলো মুক্ত হয়ে ভ্রমণ শুরু করে। সেই আলোই আজ CMB হিসেবে পৌঁছাচ্ছে। তাপমাত্রা এত কম হওয়ার কারণ মহাবিশ্বের প্রসারণ: আলো ভ্রমণের 13.8 বিলিয়ন বছরে স্থান প্রায় 1100 গুণ প্রসারিত হয়েছে — তরঙ্গদৈর্ঘ্যও 1100 গুণ বেড়ে বিকিরণ মাইক্রোওয়েভ অঞ্চলে নেমে এসেছে এবং সমতুল্য কৃষ্ণবস্তু তাপমাত্রা 3000 K থেকে 2.725 K-এ নেমে গেছে। CMB প্রায় নিখুঁত কৃষ্ণবস্তু বর্ণালি ও প্রায় সর্বত্র সমান — তবে 10⁻⁵ মাত্রার ক্ষুদ্র তাপমাত্রা-ওঠানামা আছে, যেগুলোই পরবর্তী গ্যালাক্সির বীজ (আদি ঘনত্বের ভাঁজ)। 1965 সালে পেনজিয়াস ও উইলসন দুর্ঘটনাবশত এটিকে শনাক্ত করেন — প্রথমে যন্ত্রের নয়েজ ভেবেছিলেন!
প্রশ্ন 08: নক্ষত্র জন্ম নেয় কীভাবে? মূল ধারার নক্ষত্র বলতে কী বোঝ?
উত্তর: তারা-গঠনকারী মেঘের (nebula) কোনো অংশ যথেষ্ট ঘন ও ঠান্ডা হলে নিজের মহাকর্ষে সংকুচিত হতে শুরু করে; সংকোচনে কেন্দ্রের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে প্রায় 10⁷ K-এ পৌঁছালে হাইড্রোজেন ফিউশন জ্বলে ওঠে — জন্ম নেয় নক্ষত্র। এরপর নক্ষত্র তার জীবনের সবচেয়ে লম্বা পর্ব কাটায় মূল ধারায় (main sequence) — কেন্দ্রে H → He ফিউশন চলতে থাকে, বাইরের দিকে বিকিরণ-চাপ ও ভেতরের দিকে মহাকর্ষের টান ভারসাম্যে থাকে, গঠন স্থিতিশীল। সূর্য এখন এই পর্বেই আছে, প্রায় 5 বিলিয়ন বছর ধরে, আরও প্রায় সমান সময় থাকবে। ভরের ভূমিকা নির্ধারক: ভারী নক্ষত্র জ্বালানি ঝড়ের গতিতে খরচ করে (উচ্চ তাপে ফিউশন দ্রুত) — মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছরেই জীবন শেষ; হালকা নক্ষত্র টেকে ট্রিলিয়ন বছর। অর্থাৎ ভর বেশি মানেই আয়ু কম — জ্যোতির্বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা-স্বজ্ঞাত সত্য। কেন্দ্রের হাইড্রোজেন ফুরালেই মূল ধারার পর্ব শেষ।
প্রশ্ন 09: লাল দৈত্য ও শ্বেত বামন কী? সূর্যের ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হবে?
উত্তর: কেন্দ্রের হাইড্রোজেন শেষ হলে কেন্দ্র সংকুচিত ও উত্তপ্ত হয়, তার চারদিকের খোলসে ফিউশন শুরু হয় — বাইরের স্তর ফুলে ও ঠান্ডা হয়ে নক্ষত্র বিপুল লাল দৈত্যে (red giant) পরিণত হয়: আকার শত গুণ, পৃষ্ঠ ঠান্ডা ও লাল কিন্তু মোট দীপ্তি বেশি। মাঝারি ভরের নক্ষত্রে (সূর্যসমূহ) এরপর বাইরের স্তর ছিটকে গ্রহ-নীহারিকা (planetary nebula) তৈরি করে এবং কেন্দ্রভাগ সংকুচিত হয়ে শ্বেত বামন হয় — প্রায় পৃথিবীর সমান আকারে সূর্যের অর্ধেক ভর জমা, ইলেকট্রন-অধঃপতন চাপে (electron degeneracy) টিকে থাকে, ফিউশন নেই — ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে কালো বামনের দিকে যায়। সূর্যের ভাগ্যও এই: প্রায় 5 বিলিয়ন বছর পর লাল দৈত্য হয়ে বুধ-শুক্র (সম্ভবত পৃথিবীও) গ্রাস করবে, শেষে শ্বেত বামন। শ্বেত বামনের সর্বোচ্চ ভর চন্দ্রশেখর সীমা প্রায় 1.4 M☉ — এর বেশি হলে অধঃপতন চাপও টান ঠেকাতে পারে না।
প্রশ্ন 10: সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে কেন? ভারী মৌল তৈরিতে এর ভূমিকা কী?
উত্তর: ভারী নক্ষত্রে (প্রায় 8 M☉-এর বেশি) ফিউশন ধাপে ধাপে এগিয়ে লোহার কেন্দ্র তৈরি হয় — লোহার ফিউশনে শক্তি মেলে না (বন্ধন শক্তির শিখরে লোহা), ফলে চাপের ভরসা নষ্ট হয়ে কেন্দ্র নিজ মহাকর্ষে মুহূর্তে ধসে পড়ে; ধসের প্রত্যাঘাত ও নিউট্রিনো-বিস্ফোরণে বাইরের সব স্তর প্রচণ্ড বেগে ছিটকে যায় — সুপারনোভা, যা কয়েক সপ্তাহ পুরো গ্যালাক্সির সমান আলো দেয়। ভূমিকা দ্বিগুণ: (1) লোহার চেয়ে ভারী মৌল (সোনা, ইউরেনিয়াম…) সংশ্লেষণের জন্য দরকারি চরম তাপ ও নিউট্রন-প্রবাহ শুধু এই বিস্ফোরণেই (ও নিউট্রন-নক্ষত্র সংঘর্ষে) মেলে; (2) বিস্ফোরণ নক্ষত্রে তৈরি মৌলগুলোকে মহাকাশে ছড়িয়ে দেয় — কার্বন, অক্সিজেন, লোহাসহ পৃথিবী ও আমাদের দেহের উপাদান ভূতপূর্ব নক্ষত্রের চুল্লিতেই তৈরি। “আমরা নক্ষত্রের ধুলো” — আক্ষরিক সত্য। কেন্দ্রের অবশেষ হয় নিউট্রন নক্ষত্র বা (আরও ভারী হলে) কৃষ্ণগহ্বর।
প্রশ্ন 11: কৃষ্ণগহ্বর থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না কেন? ঘটনা দিগন্ত বলতে কী বোঝ?
উত্তর: পালানোর বেগ বস্তুর ভর ও আকারের ওপর নির্ভর করে: v_esc = √(2GM/R) — একই ভরকে যথেষ্ট ছোট ব্যাসার্ধে সংকুচিত করলে পালানোর বেগ আলোর বেগ c-কে ছাড়িয়ে যায়। সেই সংকট ব্যাসার্ধটি সোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ (R_s = 2GM/c²; সূর্যের জন্য প্রায় 3 km, পৃথিবীর জন্য প্রায় 9 mm)। এই ব্যাসার্ধের পৃষ্ঠটিই ঘটনা দিগন্ত (event horizon) — এর ভেতরে পড়লে বাইরে ফেরা অসম্ভব, কারণ বেরোনোর জন্য c-এর বেশি বেগ লাগত, আর ভেতরের সব সম্ভাব্য পথই কেন্দ্রের (singularity) দিকেই যায়; আলো নিজেও সর্বোচ্চ বেগে আটকা। তাই কৃষ্ণগহ্বর সরাসরি দেখা যায় না — পর্যবেক্ষণ হয় চারদিকের গরম গ্যাসের বৃত্ত (accretion disc) ও মহাকর্ষের প্রভাব দেখে; 2019 সালে M87* এর ছায়ার ছবিই প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ। হকিং বিকিরণ কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত ধীরে ভর কমায় — তবে নক্ষত্র-ভরের গহ্বরের ক্ষেত্রে তা কার্যত উপেক্ষণীয়।
প্রশ্ন 12: নিউট্রন নক্ষত্র ও পালসার বলতে কী বোঝ?
উত্তর: সুপারনোভায় ধসে পড়া কেন্দ্রের ভর চন্দ্রশেখর সীমার বেশি কিন্তু কৃষ্ণগহ্বর হওয়ার মতো যথেষ্ট না হলে (প্রায় 1.4–3 M☉) চাপে প্রোটন-ইলেকট্রন মিলে নিউট্রন হয়ে যায় — পুরো নক্ষত্রটি যেন একটি বিশাল নিউক্লিয়াস: প্রায় 10–20 km ব্যাসে সূর্যের চেয়েও বেশি ভর, ঘনত্ব নিউক্লিয়ার ঘনত্বের (এক চা-চামচে প্রায় এক বিলিয়ন টন)। নিউট্রনের অধঃপতন চাপ আরও ধস ঠেকায়। এরা অত্যন্ত দ্রুত ঘোরে (সংকোচনে কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষণের ফল) ও প্রবল চৌম্বক ক্ষেত্রবিশিষ্ট। চৌম্বক মেরু থেকে বিকিরণ রশ্মি বেরোয় — ঘূর্ণনে রশ্মিটি বাতিঘরের মতো ঘুরে আমাদের কাছে নিয়মিত স্পন্দন আকারে ধরা পড়লে তাকে পালসার বলে। পালসারের স্পন্দন পারমাণবিক ঘড়ির মতো সুনিয়মিত — সময় মাপা থেকে মহাকর্ষ-তরঙ্গ শনাক্তকরণ পর্যন্ত কাজে লাগে।
প্রশ্ন 13: ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের প্রমাণ কী? তা “ডার্ক” কেন?
উত্তর: প্রধান প্রমাণ গ্যালাক্সির ঘূর্ণন বক্ররেখা: দৃশ্যমান নক্ষত্র ও গ্যাসের মহাকর্ষ অনুযায়ী বাইরের নক্ষত্রদের বেগ দূরত্বে কমে যাওয়ার কথা (কেপলারীয় পতন), কিন্তু বাস্তবে বেগ প্রায় ধ্রুব থাকে — হিসাব মেলাতে চারদিকে অদৃশ্য ভরের বিশাল হেলো (halo) ধরতে হয়, যা দৃশ্যমান ভরের প্রায় 5–6 গুণ। সহায়ক প্রমাণ: গ্যালাক্সি গুচ্ছে মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের বাড়তি বাঁক, CMB-র ওঠানামার হিসাব, বুলেট ক্লাস্টারে লেন্সিং-কেন্দ্র গ্যাস থেকে আলাদা হওয়া। “ডার্ক” because এটি তড়িৎচুম্বক বিকিরণের সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়াই করে না — আলো ছাড়ে না, শোষণ করে না, প্রতিফলনও নয়; শুধু মহাকর্ষ দিয়েই তার উপস্থিতি ধরা যায়। পরিচয় এখনো অজানা (WIMP ধরনের কণা সন্দেহভাজন) — তবে মহাবিশ্বের ভরের প্রায় 27% এই অদৃশ্য উপাদান, সাধারণ দৃশ্যমান ভর মাত্র প্রায় 5%।
প্রশ্ন 14: ডার্ক এনার্জি বলতে কী বোঝ? মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ত্বরণশীল জানা গেল কীভাবে?
উত্তর: 1998 সালে দূরের টাইপ Ia সুপারনোভা পর্যবেক্ষণে দেখা গেল সেগুলো প্রত্যাশার চেয়ে ম্লান — অর্থাৎ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দূরে: মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ মহাকর্ষের টানে মন্দীভূত না হয়ে বরং ত্বরণ পাচ্ছে। এই ত্বরণের দায়ী রহস্যময় শক্তিরূপের নাম দেওয়া হয়েছে ডার্ক এনার্জি — এটি স্থানের নিজের ধর্ম মনে করা হয় (আইনস্টাইনের মহাজাগতিক ধ্রুবক Λ-এর পুনরুত্থান): স্থান প্রসারিত হলে এর পরিমাণও বাড়ে, ঋণাত্মক চাপের মতো কাজ করে বিকর্ষণ ঘটায়। বর্তমান হিসাবে মহাবিশ্বের মোট শক্তি-ভরের প্রায় 68% ডার্ক এনার্জি, 27% ডার্ক ম্যাটার, মাত্র 5% সাধারণ পদার্থ। আবিষ্কারটি নোবেল পুরস্কার পায় (2011)। প্রকৃতি এখনো পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর একটি — তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে পর্যবেক্ষিত মানের বিশাল ব্যবধান (প্রায় 10¹²⁰ গুণ) “সবচেয়ে খারাপ ভবিষ্যদ্বাণী” নামে কুখ্যাত।
প্রশ্ন 15: মহাকাশে টেলিস্কোপ বসানোর সুবিধা কী? জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ অবলোহিত রশ্মিতে কাজ করে কেন?
উত্তর: বায়ুমণ্ডল তিনভাবে বাধা দেয়: (1) মেঘ ও বায়ুপ্রবাহের ঝাপসা (seeing) — প্রতিবিম্ব অস্পষ্ট করে; (2) শোষণ — অতিবেগুনি, অধিকাংশ অবলোহিত, X-রশ্মি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায়ই না; (3) আলোক দূষণ ও নিজস্ব তাপ-বিকিরণ। মহাকাশে টেলিস্কোপ এসব থেকে মুক্ত: নিখুঁত তীক্ষ্ণ ছবি ও পুরো বর্ণালি। জেমস ওয়েবের (JWST) অবলোহিত পছন্দের কারণ: সবচেয়ে দূরের (আদি) গ্যালাক্সির আলো মহাবিশ্বের প্রসারণে এতটাই লাল-সরে গেছে যে তা অবলোহিত ছাড়া দেখাই যাবে না; আবার নক্ষত্র-জন্মের ধুলো-মেঘের ভেতর দেখতে পারেও অবলোহিত (ধুলো এড়িয়ে যায়)। ওয়েবকে L2 বিন্দুতে (পৃথিবী থেকে প্রায় 15 লক্ষ km) রেখে সূর্য-ঢাল দিয়ে প্রায় −233°C-এ ঠান্ডা রাখা হয় — নইলে নিজের তাপ-বিকিরণই লক্ষ্যের ম্লান সংকেত ডুবিয়ে দিত।
প্রশ্ন 16: রেডিও টেলিস্কোপ দিনের বেলায়ও পর্যবেক্ষণ করতে পারে কেন? এর আয়না এত বড় হয় কেন?
উত্তর: রেডিও তরঙ্গ বায়ুমণ্ডল ভেদ করে দিন-রাত, মেঘ সত্ত্বেও পৌঁছায়; সূর্য আমাদের বেতার-আকাশের একমাত্র প্রধান বাধা হলেও লক্ষ্য অন্যদিকে থাকলে দিনের বেলায় পর্যবেক্ষণে কোনো সমস্যা হয় না — অপটিক্যাল টেলিস্কোপের মতো অন্ধকারের অপেক্ষা লাগে না। আয়না বিশাল হওয়ার দুটি কারণ: (1) রেডিও তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক বড় (সেমি থেকে মিটার), বিচ্ছেদন θ ≈ λ/D — গ্রহণযোগ্য তীক্ষ্ণতা পেতে D শত মিটার মাত্রায় নিতে হয় (FAST টেলিস্কোপ 500 m); (2) মহাজাগতিক রেডিও সংকেত অতিম্লান — সংগ্রহ ক্ষেত্রফল যত বড়, সংকেত তত ধরা পড়ে। একক ডিশের সীমা টপকাতে অনেকগুলো ছোট অ্যান্টেনার সমন্বয়ে ইন্টারফেরোমিটার গড়া হয় — কার্যকর বিচ্ছেদন অ্যান্টেনাগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবধানের সমান। নির্মাণে স্বস্তি: তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় বলে পৃষ্ঠের নির্ভুলতা মিলিমিটার মাত্রায় হলেই চলে — অপটিক্যালের ন্যানোমিটার-নিখুঁত অসম্ভব দাবি নেই।
প্রশ্ন 17: ডপলার প্রভাব জ্যোতির্বিজ্ঞানে কীভাবে ব্যবহৃত হয়? বহিঃগ্রহ (exoplanet) খোঁজায় এর ভূমিকা কী?
উত্তর: নক্ষত্রের বর্ণালি রেখার ডপলার সরণ থেকে তার রেডিয়াল বেগ (আমাদের দিকে আসা-যাওয়ার হার) মাপা হয় — গ্যালাক্সির ঘূর্ণন, যুগ্ম নক্ষত্রের কক্ষপথ, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ — সব এই কৌশলে। বহিঃগ্রহ (সৌরজগতের বাইরের গ্রহ) খোঁজায় রেডিয়াল-বেগ পদ্ধতি: গ্রহ ও নক্ষত্র দুজনেই তাদের যৌথ ভরকেন্দ্রের চারদিকে ঘোরে — গ্রহ নিজে দেখা না গেলেও নক্ষত্রের ছোট্ট পর্যায়ক্রমিক “দুলুনি” তার বর্ণালি রেখার সামান্য আগু-পিছু সরণে ধরা পড়ে; সরণের পর্যায়কাল ও মাত্রা থেকে গ্রহের কক্ষকাল ও ন্যূনতম ভর জানা যায়। সংবেদনশীলতা এখন প্রায় cm/s মাত্রার — পৃথিবী-সদৃশ গ্রহের সন্ধানও এই পথেই এগোচ্ছে। সীমাবদ্ধতা: কক্ষপথের তল আমাদের দৃষ্টির প্রায় সমান্তরাল না হলে সরণ ধরা পড়ে না, আর গ্রহটির অবস্থান সরাসরি দেখা যায় না — অন্য পদ্ধতি (ট্রানজিট) পরিপূরক।
প্রশ্ন 18: নক্ষত্রের বর্ণালি শ্রেণি (O, B, A, F, G, K, M) কীসের ভিত্তিতে করা হয়?
উত্তর: শ্রেণিবিন্যাস মূলত পৃষ্ঠ তাপমাত্রা অনুযায়ী — বর্ণালিতে কোন মৌল/আয়নের শোষণ রেখা কত শক্তিশালী তা তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে: অতি উত্তপ্ত নক্ষত্রে (O, প্রায় 30,000 K-এর বেশি) আয়নিত হিলিয়ামের রেখা, মাঝারি তাপে (G — সূর্য, প্রায় 5,800 K) ধাতব রেখা ও হাইড্রোজেনের ভারসাম্য, ঠান্ডা নক্ষত্রে (M, প্রায় 3,000 K) অণুর (TiO) ব্যান্ড। ক্রমটি: O (নীল) > B > A (সাদা) > F > G (হলুদ) > K (কমলা) > M (লাল) — রঙ ও তাপমাত্রা একই কথা বলে। প্রতিটি শ্রেণি আবার 0–9 উপশ্রেণিতে ভাগ। হার্টজস্প্রং-রাসেল (H–R) চিত্রে এই শ্রেণি অনুভূমিক অক্ষ — নক্ষত্রের ভর, আয়ু ও পরিণতি পড়ার মূল মানচিত্র। মনে রাখার ছড়া প্রচলিত: “Oh Be A Fine Girl/Guy, Kiss Me”। তাপমাত্রাই একমাত্র মাপকাঠি নয় — একই তাপমাত্রায় দানব ও বামনের দীপ্তি আলাদা বলে দীপ্তি-শ্রেণিও সঙ্গে উল্লেখ করা হয়।
প্রশ্ন 19: বাসযোগ্য অঞ্চল (habitable zone) বলতে কী বোঝ?
উত্তর: কোনো নক্ষত্রের চারপাশের সেই কক্ষীয় বলয়কে বাসযোগ্য অঞ্চল বলে, যেখানে গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকা সম্ভব — খুব কাছে হলে পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায় (runaway greenhouse), খুব দূরে হলে জমে বরফ হয়। সূর্যের ক্ষেত্রে অঞ্চলটি প্রায় 0.95–1.4 AU-এর মধ্যে, পৃথিবী স্বস্তিতে ভেতরে — শুক্র ভেতরের প্রান্তের বাইরে গিয়ে ভোগান্তিতে, মঙ্গল বাইরের কিনারায়। অঞ্চলটির অবস্থান নক্ষত্রের দীপ্তির ওপর নির্ভরশীল: ম্লান লাল বামনের ক্ষেত্রে অনেক কাছে, উজ্জ্বল নক্ষত্রে অনেক দূরে। সতর্কতা: বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকাই জীবনের গ্যারান্টি নয় — বায়ুমণ্ডল, চৌম্বক ক্ষেত্র, গ্রহের ভরসহ আরও শর্ত লাগে; অঞ্চলটি শুধু প্রথম ছাঁকনি। তথাপি বহিঃগ্রহ অনুসন্ধানের অগ্রাধিকার-মানদণ্ড এটাই — Kepler ও TESS মিশন এই অঞ্চলের পৃথিবী-আকারের গ্রহ খুঁজতেই নকশা করা।
প্রশ্ন 20: হাবল ধ্রুবক থেকে মহাবিশ্বের বয়স অনুমান করা হয় কীভাবে?
উত্তর: হাবলের সূত্র v = H₀d-কে সময়ের দিকে উল্টে চালালে: একটি গ্যালাক্সি d দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় নিয়েছে প্রায় t ≈ d/v = 1/H₀ — দূরত্ব নির্বিশেষে সব গ্যালাক্সির জন্যই এই মান একই, অর্থাৎ সবাই একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিল — এটাই সম্প্রসারণের বয়সের সরল অনুমান (হাবল সময়)। H₀ ≈ 70 km/s/Mpc হলে 1/H₀ ≈ 14 বিলিয়ন বছর — বিস্তারিত হিসাবে (মন্দন-ত্বরণের ইতিহাসসহ) প্রকৃত বয়স 13.8 বিলিয়ন বছর। ঐতিহাসিক ঝামেলা: হাবলের নিজের মাপা ধ্রুবক ছিল প্রায় 7 গুণ বেশি — তাতে বয়স আসত পৃথিবীর শিলার বয়সেরও কম! দূরত্ব-সিঁড়ির ক্রমাঙ্কন ঠিক হতে হতে ধ্রুবক নেমে আসে। আজও দুটি শ্রেষ্ঠ পদ্ধতির (CMB-ভিত্তিক ও স্থানীয় দূরত্ব-সিঁড়ি) মানে প্রায় 8% অমিল আছে — “হাবল টান” আধুনিক কসমোলজির জীবন্ত বিতর্ক।
প্রশ্ন 21: মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আমরা নিজেদের অবস্থান জানি কীভাবে? গ্যালাক্সির পুরো ছবি তোলা যায় না কেন?
উত্তর: আমরা গ্যালাক্সির ভেতরে বসে আছি — বাইরে গিয়ে ওপর থেকে ছবি তোলা অসম্ভব (নিকটতম বড় গ্যালাক্সিই 25 লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে; কোনো মহাকাশযান সেই পথের ভগ্নাংশও যায়নি)। ছবির বদলে গড়া হয় মানচিত্র: নক্ষত্রের দূরত্ব-দিক মেপে (Gaia মিশন কোটি নক্ষত্রের অবস্থান দিয়েছে), গ্যাস-মেঘের রেডিও মানচিত্র ও অন্য সর্পিল গ্যালাক্সির সাদৃশ্য মিলিয়ে মিল্কিওয়ের গঠন অনুমান করা হয় — এটি কেন্দ্রীয় দণ্ডসহ সর্পিল (barred spiral) গ্যালাক্সি, ব্যাস প্রায় 100,000 আলোকবর্ষ। সূর্য কেন্দ্র থেকে প্রায় 26,000 আলোকবর্ষ দূরে ওরিয়ন বাহুর কিনারায় — কেন্দ্রের অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর (Sagittarius A*, প্রায় 40 লক্ষ সূর্য-ভর) থেকে নিরাপদ দূরত্বে। কেন্দ্রের দিকটা অপটিক্যাল আলোতে ধুলোর মেঘে ঢাকা — রেডিও ও অবলোহিত দিয়ে ভেতর দেখতে হয়। অন্য গ্যালাক্সির পূর্ণ ছবি সহজেই তোলা যায় — নিজের বাড়ির ভেতর থেকে পুরো বাড়ির ছবি তোলা যায় না, এই একই সীমাবদ্ধতা।
প্রশ্ন 22: টেলিস্কোপের বিচ্ছেদন ক্ষমতা ও আলো-সংগ্রহ ক্ষমতা দুটোই বড় আয়নায় বাড়ে কেন?
উত্তর: দুটো ক্ষমতাই অভিলক্ষ্যের ব্যাস D-এর কারক: (1) বিচ্ছেদন — অপবর্তন সীমা θ_min = 1.22λ/D; D বড় হলে ক্ষুদ্রতম পৃথকীকরণ কোণ কমে, কাছাকাছি দুটি নক্ষত্র বা গ্রহের বিবরণ আলাদা ধরা পড়ে। চোখের তারারন্ধ্র মাত্র মিলিমিটার বলে চোখের বিচ্ছেদন প্রায় 1 আর্কমিনিটে আটকে থাকে; 10 m আয়নার টেলিস্কোপ অপবর্তন-সীমায় তার হাজার গুণ সূক্ষ্ম বিবরণ দিতে পারে (বাস্তবে বায়ুমণ্ডল বাধা দেওয়ায় adaptive optics লাগে)। (2) আলো-সংগ্রহ — ক্ষেত্রফল ∝ D²; D দ্বিগুণ মানে চার গুণ বেশি ফোটন — ম্লানতর বস্তু দেখা যায় ও বর্ণালি মাপার সময় কমে। দূরের মহাবিশ্ব দেখা মানেই ফোটনের দুর্ভিক্ষের সঙ্গে লড়াই — বড় আয়না দুই ফ্রন্টেই জেতায়, তাই টেলিস্কোপের ইতিহাস মূলত আয়না বড় করারই ইতিহাস। বিবর্ধন কিন্তু এই দুটোর কোনোটাই নয় — ফাঁকা বিবর্ধন বিবরণ বাড়ায় না, ভুল ধারণা ভাঙা জরুরি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল বার্তা: আলোই আমাদের একমাত্র বার্তাবাহক — তার সরণ, বর্ণালি ও তীব্রতা পড়েই মহাবিশ্বের মানচিত্র, ইতিহাস আর আমাদের নিজেদের উৎস জানা যায়। এই পোস্ট দিয়ে পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রের সব অধ্যায়ের অনুধাবনমূলক ম্যারাথন সম্পূর্ণ হলো।
